সব
রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ২৮ চৈত্র ১৪২৭
AD

পৌনঃপুনিক

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০১
যথারীতি ছেলের বাবা মা আংটি পরিয়ে দিয়ে তারিখ নির্ধারণ করে গেলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না চূড়ান্ত দিনটিতে লাল বেনারসি ঘোমটা মুড়ি দিয়ে বাবার বন্ধুর বাড়িতে বধূ সাজে পদার্পণ করল মীনা । দিন কয়েক পরে মিজানের কর্মস্থল ঢাকা শহরে মিজানের কোয়ার্টারের একচ্ছত্র গিন্নি পদে যোগদান করে ঘরকন্নায় ব্রতী হলো। বদলির চাকরির সুবাদে দুচার বছর পর পর এ শহর ও শহর ঘোরাঘুরিও হলো অনেক

খবরটা শোনার পর থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া অনুভব করলেন তারানা নিজের মনে। শোনা অবধি কেমন যেন একটা দায়বদ্ধতা চেপে বসে তারানার কাঁধে। নিজের অবস্থানটাকে মাঝপথে কল্পনা করে প্রথমেই ভেবে নেন শুরুটা করবেন কোত্থেকে? ব্যাপারটা যখন মিজান সাহেবের, নিশ্চয়তাটা নিতে হবে সেখান থেকেই আগে। আবার খুব বেশি নিশ্চিত হওয়ার পর মীনা ভাবি যদি মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে তো পণ্ডশ্রম সবটুকুই। সাত-পাঁচ ভেবে মীনা ভাবির জন্যই মনটা উচাটন হলো তারানার।

ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো পেশায় নিয়োজিত তারানা আগাগোড়া। বর্তমানে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেছেন। একমাত্র মেয়ে নাফিসার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বাড়িটাই কেমন ধু ধু করে। ব্যবসায়ী স্বামী আজ দেশে তো কাল বিদেশে। আজ এ শহর তো কাল ও শহর। মিটিং সেমিনার কনফারেন্স নিয়ে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন। তারানা বেগম কখনো কখনো সঙ্গী হন সাগর পাহাড় কিংবা অভয়ারণ্যের হাতছানিতে। তবে ইদানীং ডায়াবেটিস ভর করায় নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে নিয়মমাফিক চলাফেরাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ল্যাপটপে বসে নাফিসার সঙ্গে মন চাইলে যে একটু গালগল্প করবেন তা হয় না। একে তো দুই দেশের সময়ের অমিল তারপর আবার মাস তিনেক হলো জবে ঢুকেছে নাফিসা। খবরের কাগজে হেডিং এ চোখ বুলিয়ে দেয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে টেলিফোনে নাম্বার ঘুরালেন তারানা। ও প্রান্তে মীনার কণ্ঠ

- হ্যালো।

- মীনা ভাবি কেমন আছ?

- তারানা ভাবি যে, দেশে আছ তুমি?

কৃত্রিম অভিমানে বলে মীনা।

- আছি ভাবি, দেশেই আছি। সেদিন কি আর আছে, শরীরটা একটু অনিয়ম হলেই বিদ্রোহ করে বসে। আমার কথা থাক আজ। তোমার কথাই বলি।

এরপর তারানা ভূমিকা ছাড়াই যা বললেন মীনার মাথা থেকে পা পর্যন্ত শিরশিরে একটা ঢেউ বয়ে গেল। সারা চেতনা যেন মুহূর্তের মধ্যে অবশ হয়ে গেল। কী জবাব দেয়া উচিত কিংবা উচিত নয় কিছুই জোগালো না মাথায়। তারানা ফোনের ওপ্রান্তে ব্যাপারটা ঠিক আঁচ করলো। দীর্ঘ সময়ের বন্ধুত্ব। দুজনে এক সময় পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বিশটি বছর পার করেছে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতায়। ওপ্রান্তে মীনার অনড় মূর্তি কল্পনা করে আবার কথা বলে তারানাই

- হ্যালো ভাবি তোমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি। এখনই কিছু বলতে হবে না। তুমি ফোন রাখ। আমি সন্ধ্যা নাগাদ আসছি, কথা হবে। 

নীরবে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন মীনা।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন ড্রেসিং টেবিলের সামনে। ছোট্ট টুলটায় বসলেন আয়নার মুখোমুখি। একটু কি চমকে উঠলেন? নাকি দীর্ঘ দশটি বছর পর নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করলেন। এক সময়ের সবার নজরকাড়া সুন্দরী মীনার টান টান চেহারায় আজ বয়স অতিক্রান্তের ছাপ স্পষ্ট। তিন তিনটি কচি মুখের বড় হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে আর এ বড় করার পেছনে সংগ্রামরত মীনা রাতদিনের ফারাক না রেখেই পার করছেন বহু দিন-মাস-বছর। আজ অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে সেই মুখ তিনটির জন্যই জীবনের হিসাব মিলাতে বসেছেন। নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়ার কিইবা আছে আর। তবে কী সন্তানদের তিনি বঞ্চিত করছেন পিতৃস্পর্শ থেকে। তার মতামতের কী আজ সত্যিই প্রয়োজন?

ত্রিশ বছর আগের সেই দিনটাকে মনে পড়ল হঠাৎ। এত অস্থিরতার মাঝেও হাসি পেল মীনার। হায়রে সময়, সেদিন আর এদিন। স্কুল ডিঙিয়ে সবে কলেজের গণ্ডিতে প্রবেশ করেছে তখন মীনা। রাতের খাবার দিতে দিতে মা-ই প্রথম তুললেন কথাটা। ভূমিকা ছাড়াই বাবা বললেন, আমার বন্ধুর ছেলে মিজান ভালো চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত। তোমাকে কলেজে দেখে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আমি আগাতে চাই। তুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে তোমার মাকে জানাবে।

ব্যস এটুকুই। অথচ মীনার অনেক কিছু ঘটে গেল অন্তরে বাইরে। শত চেষ্টাতেও একটি ভাতও আর গলা দিয়ে নামল না। ঘামতে থাকল অনর্গল। শেষমেশ খাওয়া ইস্তফা দিয়ে পালিয়ে বাঁচল আপাতত। নিজ ঘরে দরজা ভিড়িয়ে আয়নার সামনে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল নিজেকে। লজ্জায় লাল হয়ে অদেখা-অচেনা বাবার বন্ধুর ছেলেটির মুখটি কল্পনায় আঁকতে বৃথা চেষ্টাও করল। সিদ্ধান্ত জানাবার আর কোনো প্রশ্নই উঠল না।

যথারীতি ছেলের বাবা মা আংটি পরিয়ে দিয়ে তারিখ নির্ধারণ করে গেলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না চূড়ান্ত দিনটিতে লাল বেনারসি ঘোমটা মুড়ি দিয়ে বাবার বন্ধুর বাড়িতে বধূ সাজে পদার্পণ করল মীনা । দিন কয়েক পরে মিজানের কর্মস্থল ঢাকা শহরে মিজানের কোয়ার্টারের একচ্ছত্র গিন্নি পদে যোগদান করে ঘরকন্নায় ব্রতী হলো। বদলির চাকরির সুবাদে দুচার বছর পর পর এ শহর ও শহর ঘোরাঘুরিও হলো অনেক। একে একে সংসারও মুখরিত হয়ে উঠতে লাগল পর পর তিনটি সন্তানের কলকাকলিতে। প্রাইমারি পর্যন্ত তেমন অসুবিধে মনে হয়নি। কিন্তু বড় ছেলেটা যখন ওপরের ক্লাসগুলোয় স্কুল পরিবর্তনে বিব্রত হতে লাগল মীনার পরামর্শে মিজান সংসারটাকে ঢাকাতেই থিতু করে ফেললেন। অফিস লোন আর নিজের পৈতৃক সম্পত্তির যোগসাজশে ছোট একটা অ্যাপার্টমেন্টের মালিকানাও দিয়ে ফেললেন মীনাকে। 

এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। মিজান সপ্তাহান্তে-মাসান্তে আসা যাওয়া করতেন বদলির চাকরির দূরত্ব ভেদে। শহর থেকে শহরের দূরত্ব বাড়ে, মিজানেরও দূরত্ব বাড়ে মনের। একটু একটু করে অনেকটাই বেড়ে যায় এক সময়। সন্তানদের পড়ালেখা স্কুল কলেজ কোচিং প্রাইভেট ইত্যাদির বেড়াজালের আচ্ছন্নতায় বড় দেরিতেই টের পান মীনা ব্যাপারটা। ততদিনে মিজান কলিগ সোনিয়ার মোহে আবিষ্ট হয়ে পড়েছেন পুরোপুরি। অভিমানী মীনা অভিমান আর অপমানে মিজানের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন মনের দিক থেকে। একই ছাদের নিচে বাস করলেও দূরত্ব তৈরি হয় যোজন-যোজন। অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীরা মীনাকে অনমনীয় মনোভাবের জন্য দায়ী করেন। কিন্তু মীনার সব সময় মনে হয়েছে জোর করে কিছু ঠেলে গিলিয়ে উগলানোর চাইতে সেটাকে উপেক্ষা করাই ভালো। করেছেও তাই। দিনের পর দিন দুজন দুজনের প্রতি উদাসীন থেকেছে। কেউ কারে সঙ্গে কথা বলেনি, কেউ কারো চোখের দিকে তাকিয়ে দূরত্বটা কমানোর প্রয়োজন মনে করেনি। দিন তো আর এভাবে গড়াতে থাকবে না, এক সময় স্থির হবে। বিশটি বছরের দাম্পত্য জীবনের ভালোবাসাগুলো মিজানের অনুভবে অনুরণন তুলবে একদিন না একদিন। সন্তান তিনটির মুখের দিকে তাকিয়ে ওদের মায়ের প্রয়োজনীয়তাটুকু মনের কোণে উঁকি তো দেবেই। বড়টা স্কুল ডিঙিয়ে সবে কলেজে বাকি দুজনও প্রাইমারি পার করেছে। বাবা-মায়ের শীতল সম্পর্কটা টের পায় ওরা। ভাবে বড়রা এত কিছু বোঝে, ছোটদের মনটা বোঝে না কেন। বাবা-মা না হাসলে যে বাচ্চাদের কান্না পায়, বাবা-মা শাসন না করলে যে পড়াতে মন বসে না। মায়ের হাতের প্রিয় রান্নাগুলোও যে বিস্বাদ লাগে। পেটে ক্ষিধে রেখেও খাবার ঠেলে উঠে যেতে হয়। বড় ছেলে শিমুল এদের মতো করে ভাবে কিনা কে জানে! তবে একদিন কলেজ থেকে ফিরে মার চোখের দিকে তাকিয়ে সারাসরি জিজ্ঞেস করে- মা, বাবার খবর কিছু রাখ? 

- না।

- এক কথায় জবাব দিয়ে আর শেষ কর না মা। 

মীনা যথাসম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বললেন 

- কেন, কী হয়েছে?

- বাবাকেই জিজ্ঞেস কর।

না আর জিজ্ঞেস করতে হয়নি। ডোর বেলের আওয়াজে নিজে এগিয়ে যান দরজা খুলতে। খুলেই দেখেন, সামনে দাঁড়িয়ে মিজান। পাশে দাঁড়ানো সোনিয়া হাতে ছোট একটা সুটকেস। ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন মীনা 

  • বাইরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে এখন ঘরে মেহমানকে আনা হয়েছে?

মিজান কিছু বলে ওঠার আগেই সোনিয়া বলে ওঠে ধীর কণ্ঠে

- সংযত হয়ে কথা বলেন, সরে দাঁড়ান। ঘরের মেহমান নই, আপনার মতোই সমান অধিকার নিয়ে এসেছি। 

তারানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিমুল একছুটে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে সোনিয়ার হাতে ধরা সুটকেসটি ছিনিয়ে সামনে রাস্তার দিকে ছুড়ে দিয়ে অঙ্গুলি নির্দেশ করে চেঁচাতে থাকে সারা শরীর কাঁপিয়ে

- চলে যান এখুনি, এই মুহূর্তে। আমার মায়ের বাড়িতে প্রবেশের কোনো অধিকার আপনার নেই। 

তারপর মাকে এক ঝটকায় ঘরের ভেতরে নিয়ে সশব্দে দরজা এঁটে দিয়ে মাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিমুল। 

- এ কাজটা না করলে তোমার অবশিষ্ট সম্মানটুকুও ধুলায় মিশে যেত। ছেলে হয়ে পুরোটাই দেখতে পারলাম না মা।

কঠিন অথচ ধীর কণ্ঠে বলল মীনা

- কিন্তু তার আশ্রয়ে আমি থাকব না আর।

- কিসের আশ্রয়, কার আশ্রয়? ওই লোকটাকে তুমি আশ্রয়দাতা ভাবছ এখনো? তার ঠাঁই তো আর এখানে হতে পারে না। এতটা বছর তো তুমি এ বাড়িতে শুধু স্ত্রীর পরিচয়েই ছিলে না, মায়ের পরিচয়েও ছিলে। যে স্ত্রীর পরিচয় তার মর্যাদা তো লেশমাত্র নেই আর। তুমি এখন এ বাড়ির সন্তানদের মা। তোমার আশ্রয়ে আমরা। এই কঠিন সত্যটাকে না মানলে আমাদের মাথার ছায়া যে সরে যাবে। তুমি বাস্তবের মুখোমুখি হও মা প্লিজ!

মীনা এবার ছেলের চোখে চোখ রাখলেন, বড্ড অচেনা কেউ যেন। এই অগোছাল নির্লিপ্ত ছেলেটা এত কথা কবে শিখল, এত ব্যথা শেয়ার করতে কে শেখাল ওকে। অদূরে দাঁড়ানো ছোট ছেলে দুটো অসহায় বোবা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। কাছে ডাকলেন ওদের। পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়ে বললেন

- যাদের মাথার ওপর এমন বড় ভাইয়ের ছায়া, তাদের এমন সামান্য ব্যাপারে ভয় পাবার কী আছে? শিমুল হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে তাকায় মার দিকে, বলে

- এই ছায়ার শক্তির উৎস যে তুমিই মা। আমাদের দিকে তাকাও, শুধু ভেঙে পড় না। 

তারপর যেন কিছুই হয়নি, কণ্ঠে এমন স্বাভাবিকতা এনে তাড়া দেয় মাকে 

  • সেই কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চা দিবে না মা?

বাইরের সমাধান এভাবে হলেও মীনার অন্তর পুড়তে থাকে নিভৃতে নীরবে।

স্বজনদের কেউ কেউ সমবেদনা জানাল, কেউবা এমন অনড় সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাল, কেউবা আবার মিজানকে নারী নির্যাতন আইনে ফাঁসিয়ে দেয়ার পরামর্শ দিল। উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হলো মিজান সেই যে নিজ বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে চলে গেল আর কখনোই এল না। মীনা ছেলেদের নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন কঠিন সংগ্রামে। এই ১০ বছরে অনেকটাই সামলে উঠেছেন চাপা দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে কর্তব্যকর্মে সচেতনতায় অভ্যস্ত হতে।

কিন্তু আজ সকালে তারানা ভাবির ফোন পাবার পর থেকে মনের মাঝে এ ঝড়কে বস করা যাচ্ছে না কিছুতেই। ঝড়ের দমকা বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে মনকে ৩০ বছর আগে সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে। 

- মা তুমি এখানে?

আয়নায় ছেলের প্রতিবিম্ব আর কর্নকুহরের চিরন্তন ডাকে চিন্তাচ্ছেদ ঘটে মীনার।

- আয় শিমুল বোস, কথা আছে। 

শিমুল মার সামনে বসে মুখের দিকে তাকিয়ে বলে 

- তুমি কি কিছু নিয়ে খুব ভাবছ মা?

- হ্যাঁ 

- আমি অনুমান করতে পারছি। তারানা চাচি আমাকেও ফোন করেছিলেন। সেই মহিলা মারা গেছেন। উনার ধারণা বাবা এবার নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় দগ্ধ হবেন। আমরা রাজি থাকলে তারানা চাচি বাবাকে ফিরিয়ে আনতে চান, আমাদের আবার আগের মতো করে দিতে চান। 

মীনা তাকালেন শিমুলের দিকে।

- চাইলেই কী আগের মতো হওয়া যায়? হতে পারে কখনো? তোর বাবা ফিরিয়ে দিতে পারবে আমার ধুলায় মেশা সম্মান? ফিরে পাব আমি আমার সন্তানদের জীবন থেকে হারান শৈশবের দশটি বছর? আমার সন্তানদের কষ্টে ভেজা দুহাতে ঠেলে পার করা দিনগুলোর যন্ত্রণা? 

- মা তোমার সন্তানদের জন্য কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ তুমি একাই তা এতদিন চিনে এসেছ। আমরা শুধু তোমার দেখান পথে চলেছি, চলব। তোমার বাড়িতে ঢোকার অধিকার সম্পূর্ণ তোমার সিদ্ধান্ত। তারানা চাচিকে এই কথাগুলোই আমি ফোনে বলেছি। 

এরপরে আর কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবতে হয়নি মীনাকে। সন্ধ্যা নাগাদ তারানা ভাবি এসেছেন, চা নাস্তা সেরে প্রতিবারের মতো চলেও গেছেন। ছেলেরা শুধু চেয়ে দেখেছে তাদের মা যে একটা সিদ্ধান্তহীনতায় বেসামাল হচ্ছিলেন, চাচি যাবার পরে সে ভাবটা একেবারেই নেই আর। নিত্যকার মতোই রান্নাঘর আর ছেলেদের ঘরে তদারকিতে ব্যস্ত হয়েছেন। টিভির খবর দেখেছেন। টালি খাতার হিসেবে ভ্রূ কুচকে চোখও বুলিয়েছেন। 

রাতে ছেলেরা যে যার ঘরে ঘুমিয়ে গেলে নিজ ঘরের লাগোয়া একচিলতে ব্যালকনিতে চেয়ারে গা এলিয়ে বসলেন মীনা। সারা দিনের বুকের জমাটবাঁধা বরফগুলো কষ্টের উত্তাপে গলিয়ে নিজেকে হালকা করতে। তারানা ভাবির কথাগুলো আবার বিছিয়ে দেখেন মীনা। মিজান সোনিয়ার দাম্পত্য জীবন ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে মনের মতো করে সেজেছিল ঠিকই। ক’বছর বাদে সংসারে নতুন মুখও এসেছে কিন্তু তার পর থেকেই সোনিয়ার অসুস্থতা বেড়ে যেতে লাগল। ধরা পড়ল কিডনি সমস্যা একেবারে শেষ ধাপে। প্রথমটায় ঘাবড়ে গেলেও নিজেকে সামলে নেয় সোনিয়া একমাত্র কন্যাশিশুটির দায়িত্ব মিজানের হাতে সঁপে দিয়ে অদ্ভুত একটা অবদার করে বসে- শত্রুপুরিতে যেন কখনই তার সন্তানকে নিয়ে মিজান না যায়। তারই নির্বাচিত পাত্রীর সঙ্গে মিজানের বিয়েটা সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দিয়ে মরতে চায়। 

ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। সোনিয়ার মৃত্যুসংবাদে যারাই মিজানের ভেঙেপড়া দেখবে বলে সমবেদনা জানাতে গিয়েছিল, তারাই অকল্পনীয় আর একটি নতুন সংসারের ভিত্তি দেখে স্তম্ভিত হয়ে ফিরে এল। 

 

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত একমাত্র গ্রন্থ মন দিগন্ত

শিল্প ও সাহিত্য বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]
AD

সাম্প্রতিক

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্য ১৭ এপ্রিল

প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্য ১৭ এপ্রিল

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

রিজভীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি

রিজভীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি

চলে গেলেন মিতা হক

চলে গেলেন মিতা হক

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

গভীর অন্ধকারের ঘুম

গভীর অন্ধকারের ঘুম

অন্ধকার

অন্ধকার

প্রবীণ ভার্সেস নবীন

প্রবীণ ভার্সেস নবীন

এক পেয়ালা চা

এক পেয়ালা চা