সব
বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮
 

অপরূপ সৌন্দর্যের সিকিম

দুপুর সাড়ে ১২টায় পৌঁছালাম শিলিগুড়ি। প্রথমে আমরা যোগাযোগের জন্য একটা সিম কিনলাম। তারপর লাঞ্চ সেরে দার্জিলিং ট্যাক্সিস্ট্যান্ড থেকে একটি ছোট টাটা অল্টো গাড়ি ১৮০০ রুপিতে গ্যাংটক এমজি মার্গ পর্যন্ত ভাড়া করলাম। গাড়িটি সিকিমের হওয়ায় এত কমে প্রাইভেট ট্যাক্সি পেলাম।

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২১, ১৫:০৯

ছবির মতো সাজানো-গোছানো ভারতের একটি প্রদেশ, যার নাম সিকিম। সিকিম সম্পর্কে যখনই জানতে পারি, তখন থেকেই সিকিম যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু সিকিমে বাংলাদেশিদের প্রবেশাধিকার না থাকায় সিকিম যাওয়া আগে কখনো সম্ভব হয়নি। পরে যখন ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে সিকিমে বাংলাদেশিদের প্রবেশাধিকার দেয়া হয়, তখন থেকেই সিকিম যাওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকি। আজকে আপনাদের সঙ্গে আমার সিকিম ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বিনিময় করব। ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর রাত ৮টায় আমি আর আমার সহকর্মী জাহিদ ভাই মিলে শ্যামলী পরিবহনে চড়ে বসলাম শিলিগুড়ি হয়ে সিকিমের উদ্দেশে। আমাদের দুজনেরই আগেই ভারতের ভিসা নেয়া ছিল এবং আগেই ট্রাভেল ট্যাক্স জমা দিয়ে টোকেন নিয়ে রেখেছি। সারা রাত ভ্রমণ শেষে ১৭ নভেম্বর সকালে পৌঁছালাম বুড়িমারী স্থলবন্দর। ফ্রেশ হয়ে বুড়িমারীর প্রখ্যাত বুড়ির দোকানে নাশতা সেরে নির্দিষ্ট সময়ে ইমিগ্রেশন শেষ করে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। চ্যাংড়াবান্ধা থেকে ডলার এক্সচেঞ্জ করে নিলাম, এখানে শিলিগুড়ি বা গ্যাংটকের চেয়ে ভালো রেট পাওয়া যায়।

দুপুর সাড়ে ১২টায় পৌঁছালাম শিলিগুড়ি। প্রথমে আমরা যোগাযোগের জন্য একটা সিম কিনলাম। তারপর লাঞ্চ সেরে দার্জিলিং ট্যাক্সিস্ট্যান্ড থেকে একটি ছোট টাটা অল্টো গাড়ি ১৮০০ রুপিতে গ্যাংটক এমজি মার্গ পর্যন্ত ভাড়া করলাম। গাড়িটি সিকিমের হওয়ায় এত কমে প্রাইভেট ট্যাক্সি পেলাম। ভাড়া করার সময় আমার ড্রাইভারকে বলে নিয়েছি রাংপোতে ইনার লাইন পারমিট (ILP) নিতে থামার কথা। বেলা আড়াইটায় শিলিগুড়ি থেকে আমাদের গাড়ি যাত্রা শুরু করল গ্যাংটকের উদ্দেশে। ছোট্ট শিলিগুড়ি শহর, ক্যান্টনমেন্ট, সেভক এরিয়া পাড়ি দিয়ে গাড়ি চলছে তিস্তা নদীর পাড়ঘেঁষা সড়ক ধরে। তিস্তার নীলচে পানির সৌন্দর্যে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। নদীর মতোই এঁকেবেঁকে রাস্তা চলে গেছে, সে রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি ছুটছে। পিচঢালা মসৃণ সড়ক, খানাখন্দ খুবই কম। আশপাশের দৃশ্য বদলাচ্ছিল একটু পরপরই। কখনো পাহাড়ের সারির পাশ দিয়ে ছুটছি, সঙ্গে ঘন গাছপালা। আবার কখনো পাহাড়গুলো দূরে সরে যাচ্ছিল, সামনে চলে আসছিল গাছের সারি আর ঘন ঘাসের জমি।

এখানে বলে রাখছি, আমার সিকিম ভ্রমণের জন্য দেশ থেকে ১০ কপি করে ছবি ও সর্বশেষ ভিসাসহ পাসপোর্টের কপি সঙ্গে নিয়ে রেখেছি। কারণ সিকিমের যেকোনো জায়গায় ভ্রমণের জন্য বিদেশি পর্যটকদের ইনার লাইন পারমিট ও রেস্ট্রিকটেড এরিয়া পারমিট (RAP) নিতে হবে ছবি ও পাসপোর্টের কপি প্রয়োজন হয়। সিকিম থেকে ফেরার সময়ও আবার রাংপোতে অবহিত করতে হয়। মজার বিষয় হচ্ছে, সিকিম প্রবেশ ও ফেরার সময় পাসপোর্টে সিল দেয়া হয়। ইনার লাইন পারমিট দিয়ে আপনি শুধু সিকিম শহর ভ্রমণ করতে পারবেন। সিকিমের অন্যান্য জায়গায় ভ্রমণ করতে হলে আপনাকে রেস্ট্রিকটেড এরিয়া পারমিট নিতে হবে, যা শুধু সিকিমের অনুমোদিত ট্যুর এজেন্ট থেকে ট্যুর প্যাকেজ নেয়ার মাধ্যমে নিতে পারবেন। ট্যুর এজেন্ট আপনাদের রেস্ট্রিকটেড এরিয়া পারমিটের ব্যবস্থা করে আপনাদের প্যাকেজ অনুযায়ী ঘোরাবে। তবে অনেক সময় গাড়ির ড্রাইভারই গাইড হিসেবে কাজ করে।

শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক যেতে ৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ও তিস্তা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে রাস্তায় একটি চা-বিরতি দিয়ে কখন যে রাংপো চেকপোস্ট পৌঁছে গেলাম, বুঝতেই পারলাম না। প্রায় ৩ ঘণ্টার মতো লাগল রাংপোতে পৌঁছাতে। রাংপোতে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল বিশাল এক ঐতিহ্যবাহী ফটক। ওপরে সবুজ চৌচালা, দুপাশে কলাম, কলামের গায়ে রংবেরঙের নকশাকাটা কারুকার্য, যা সিকিমের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। রাংপো চেকপোস্ট থেকে পাসপোর্ট ও পারমিট পেপারে এন্ট্রি সিল নিতে ২০ মিনিটের মতো লাগল। ২০-২১ জনের মতো ট্যুরিস্ট ছিল। এখান থেকে পারমটি না নিলে গ্যাংটক গিয়ে কোনো হোটেলেই থাকতে পারবেন না এবং কোথাও ঘুরতেও পারবেন না। আমরা পারমিশনের কাগজ ও পাসপোর্টে সিল নিয়ে আবার গ্যাংটকের উদ্দেশে রওনা হই। এর মধ্যেই সন্ধ্যা হয়ে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে, আশপাশের সুউচ্চ পাহাড়ি বসতির বৈদ্যুতিক আলোগুলো জ্বলে উঠেছে, মনে হচ্ছে আকাশে সারি সারি তারা জ্বলছে, সে এক অসাধারণ অনুভূতি, যা বলে প্রকাশ করা যাবে না। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা গ্যাংটক (এমজি মার্গ) পৌঁছে যাই, ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় সন্ধ্যা ৭টার কিছু বেশি। গাড়ি থেকে নামতেই বেশ ঠাণ্ডা আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরে, তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবার হোটেল নেয়ার পালা। আমরা কয়েকটা হোটেল দেখা শেষে এমজি মার্গের রেডপান্ডা স্ট্যাচুর পাশেই হোটেল বায়ুলে উঠলাম। আমরা দুজনের জন্য একটা রুম নিলাম, যার ভাড়া পড়েছিল ১ হাজার ৪০০ রুপি।

হোটেলে উঠেই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়ি পরের দিনের নর্থ সিকিমের (লাচুং ও ইয়ামথান) ট্যুর প্যাকেজ বুকিং ও রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। হোটেলের একদম কাছে এমজি মার্গ থেকে লালবাজারের দিকে নামার মুখেই ঠাকুর অ্যান্ড ব্রাদার্স ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসে গেলাম। সেখানে দেখি চট্টগ্রাম থেকে আসা বাংলাদেশি এক দম্পতিও পরের দিন লাচুং ও ইয়ামথান ভ্রমণের জন্য প্যাকেজ খুঁজতে এসেছেন। পরিচয়ের পর ওনারা আমাদের সঙ্গে লাচুং ও ইয়ামথান ভ্রমণের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তখন চারজন একসঙ্গে একটা মাহিন্দ্র স্কোরপিও জিপসহ দুই দিনের যাওয়া-আসা, থাকা, খাওয়া, রেস্ট্রিকটেড এরিয়া পারমিট নেয়া, ইয়ামাথান ভ্যালি ও লাচুং জিরো পয়েন্ট বেড়ানোসহ ১৬ হাজার রুপিতে প্যাকেজ বুকিং দিলাম। গ্যাংটকে রাত ৮টার মধ্যেই প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, তার আগেই একটি রেস্টুরেন্টে চিকেন কারি দিয়ে ভাত খেয়ে নিই। এরপর শুরু হয় মুসলিম হোটেলের সন্ধান। লাল মার্কেট দিয়ে একটু সামনে গেলে মিলবে জান্নাত হোটেল ও আসলাম বিরিয়ানি। অনেক দেশি-বিদেশি পর্যটকের পদচারণে মুখরিত গ্যাংটক শহরের এই প্রাণকেন্দ্র এমজি (মহাত্মা গান্ধী) মার্গ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব চমৎকার, ক্রাইম নেই বললেই চলে। কিছুক্ষণ এমজি মার্গে ঘুরে মহাত্মা গান্ধীর স্ট্যাচু ও রেডপান্ডা স্ট্যাচুর পাশে ছবি তুলে ফিরে এলাম হোটেলে। এবার ঘুমানোর পালা। পরদিন আবার সফর শুরু হবে।

পরদিন ১৮ নভেম্বর সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা গ্যাংটক শহরের দৃশ্য দেখতেই মনটা চনমনে হয়ে উঠল। মনের মধ্যে তখন অদ্ভুত এক অনুভূতি। ছোটবেলায় বই পড়ে যে ছবি এঁকেছি মনের মধ্যে, আজ সে ছবি বাস্তব হয়ে চোখের সামনে! সকালের অসাধারণ এমজি মার্গ দেখে কিছু ছবি তুললাম। তারপর ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে সাড়ে ৯টার সময় হোটেল থেকে চেকআউট হয়ে বেরিয়ে পড়লাম ভাজারা ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের উদ্দেশে। মূলত এখান থেকেই লাচুং-ইয়ামথান প্যাকেজের গাড়িগুলো ছেড়ে যায়। লোকাল একটা ট্যাক্সিতে জনপ্রতি ২০ রুপিতে পৌঁছে গেলাম সেখানে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের অন্য দুই সহযাত্রী দম্পতিও হাজির। আমাদের ড্রাইভারকে ফোন দিতেই সেও হাজির, আমাদের ছোট্ট একটা ব্রিফ করে নিয়ে চলল জিপের কাছে। এই দুই দিনের জন্য সে আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড, আমাদের সব লাগেজ ও ব্যাগ গাড়িতে তুলে প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে আমরা নর্থ সিকিমের (লাচুং) উদ্দেশে রওনা করলাম।

পথে কিছু জায়গা সাইটসিয়িং করি- রাংরাং ব্রিজ, নাগা ফলস, মেয়ং ফলস, সেভেন সিস্টারস ফলস, তুং ব্রিজ, অমিতাভ বচ্চন ফলস, চুংথাং ভিউ পয়েন্ট ও তিস্তা নদীতে চুংথাং হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার প্লান্ট, পাহাড়ি টানেল সড়কসহ আরো কয়েকটা পয়েন্ট- সব এখন মনে পড়ছে না। পথে আমরা প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম ভাত, ডাল, চিকেন কারি। বিকেলে টি ব্রেকের জন্য বিরতি ছিল চুংথাং ভিউ পয়েন্টে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে লাচুং পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। লাচুং পৌঁছে ড্রাইভার আমাদের নিয়ে যায় প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত হোটেল হিডেন গ্লেসারে। আমরা হোটেলে উঠে হালকা ফ্রেশ হতেই পরিবেশন করে চা-বিস্কুট। আমারা চা-বিস্কুট খেয়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যেই বেরিয়ে পড়ি রাতের ছোট্ট লাচুং শহরটা দেখার জন্য। তাপমাত্রা তখন প্রায় মাইনাস ২ ডিগ্রি, সঙ্গে হিম বাতাস। স্বল্প সময়ে যা দেখলাম, তাতে ছোট্ট লাচুং শহরটা আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। কিন্তু এখানে যে পরিমাণ ঠাণ্ডা, তাতে বেশিক্ষণ টিকতে পারলাম না। তাই হোটেলে চলে এলাম। এখানে আমাদের বাংলাদেশি ও কলকাতার কিছু মানুষ পেয়ে তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। ইতোমধ্যে আমাদের রাতের খাবার রেডি হয়ে গেল সবাই খেয়ে নিলাম। ড্রাইভার আমাদের বলে রাখে সকাল ৭টার মধ্যে রেডি থাকতে। তাই আমরা খাবার খেয়ে রুমে গিয়ে তিনটি কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার জন্য। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ছিল, শেষরাতে তাপমাত্রা মাইনাস ৬ ডিগ্রিতে নেমেছিল, নভেম্বর মাস হওয়ায় তখনো তুষারপাত শুরু হয়নি।

প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ১৯ নভেম্বর খুব ভোরে আলো আসার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠে বাইরে যেতেই লাচুংয়ের অপরূপ রূপ দেখে মনটা জুড়িয়ে গেল। হিমালয়ের পূর্ব সীমার অন্তর্গত বিশাল বিশাল পাহাড়-পর্বত চারদিকে, সেগুলোর ওপরের দিকে বরফ আচ্ছাদিত, সে যে কী অপূর্ব দৃশ্য, তা নিজে চোখে না দেখলে বলে বোঝানো যাবে না। বরফে ঢাকা চূড়াগুলোতে মেঘের ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা, যেন এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা। হিম বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ যেন ছন্দময় সুর ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। ধীরে ধীরে পুবাকাশে সূর্য উঁকি, বিপরীত দিকের পর্বতের চূড়াগুলোতে সূর্যের সোনালি আভা আছড়ে পড়তেই এক মন ভোলানো দৃশ্যের দেখা মিলল। মনে হচ্ছে, পর্বতের চূড়ায় উজ্জ্বল সোনালি দ্যুতি। এ যেন এক স্বর্গীয় সাজে সেজেছে প্রকৃতি! কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফিরে আমরা ৭টার মধ্যে রেডি হয়ে নিই এবং যথাসময়ে আমাদের ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করে দিল ইয়ামথাং ভ্যালি ও জিরো পয়েন্টের উদ্দেশে। পথে ইন্ডিয়ান আর্মির চেকপোস্টে আমাদের পারমিট চেক করে।

লাচুং থেকে পাহাড়ি সর্পিল পিচঢালা পথে ইয়ামথান ভ্যালির দূরত্ব মাত্র ২৩ কিলোমিটার। এই উপত্যকা শীতকালে পুরোপুরি ঢেকে যায় শ্বেতশুভ্র বরফের চাদরে, তখন তার অন্য এক রূপ দেখা যায়। বাকি সময় সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়া এই উপত্যকা, আর নীলরঙা তিস্তা নদীর বয়ে চলা মুগ্ধ করে ভ্রমণপিপাসুকে। ইয়ামথান ভ্যালি ফুলের সাম্রাজ্য হলেও নভেম্বরে ফুলের সম্ভাষণ পেলাম না। কিন্তু পুরো ভ্যালি শীতের আগমনের কারণে ধীরে ধীরে রূপ বদলানোতে ব্যস্ত। ভ্যালিজুড়ে পর্যটকদের বিশ্রাম নেয়ার জন্য স্থায়ীভাবে বেশ কিছু আসন পেতে রাখা হয়েছে। পথের ধারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি পাইনগাছ, নাম না জানা পাহাড়ি ফুল। যাত্রাপথের প্রতি বাঁকে সুউচ্চ পাহাড়গুলো একটাই ইঙ্গিত দেয়- সৃষ্টিকর্তাই শ্রেষ্ঠ শিল্পী। প্রায় সাড়ে ৮ হাজার ফুট উঁচু শহরের ওপর ৩-৪ হাজার ফুট উচ্চতার একেকটি পর্বত দাঁড়িয়ে আছে নিরহংকারী হয়ে। কোনোটির চূড়ায় বরফের আচ্ছাদন, আবার কোনোটির গায়ে সবুজের প্রলেপ, কোনোটি আবার ন্যাড়া হয়ে একটু গোমড়ামুখো। কোনো পাহাড় সূর্যকে আড়াল করতে ব্যস্ত, কোনোটি আবার সূর্যের আলোর প্রতিফলন আর প্রতিসরণের সূত্র মেনে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। প্রতিটি পাহাড় তার নিজস্বতায় অনন্য। পথের দুধারে পাইনগাছের সারি, বিভিন্ন পাহাড়ি ফুল বাড়িয়ে তুলেছে অপরূপ শোভা। ইয়ামথান যাওয়ার পথে একটি স্থানে আমাদের গাড়ি সকালের নাশতার জন্য বিরতি দিয়েছিল, যা আমাদের প্যাকেজভুক্ত ছিল। এখান থেকে সবাই গামবুট ভাড়া করেছি জিরো পয়েন্ট গিয়ে বরফে হাঁটার জন্য।

আমরা আবার ইয়ামথান উপত্যকা থেকে জিরো পয়েন্টের উদ্দেশে রওনা হলাম। চীন সীমান্তের কাছাকাছি বলে সাধারণ পর্যটকদের এই পর্যন্তই যাওয়ার অনুমতি মেলে। প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত জিরো পয়েন্টের অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নজর কাড়বেই। যারা গেছে, তারা জানে যে এই পথের দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। যত উঠছি চারদিকের পর্বতগুলোর গা সাদা শুভ্র বরফের চাদরে আচ্ছাদিত, পাদদেশে এখনো বরফ জমেনি। আমরা চীন সীমান্তের কাছাকাছি জিরো পয়েন্টে পৌঁছালাম। মনে হলো, পর্বতের চূড়ায় পৌঁছে গেছি। গাড়ি থেকে নেমে পাহাড়ের পাদদেশ ধরে পর্বতের বরফের দিকে হেঁটে চললাম। তবে পাদদেশ পর্বতের বরফ গলা পানিতে ভেজা, সাবধানে পা ফেলতে হয়, যদিও আমাদের বরফে হাঁটার গামবুট থাকায় কোনো সমস্যা হয়নি। তিস্তা নদীর উৎপত্তিস্থল এই স্থানটি, পাহাড়ি ছোট ছড়ার মধ্য দিয়ে এই বরফ গলা পানি প্রবাহিত হয়ে তিস্তা নদীর জন্ম দিয়েছে। ছড়াটির ওপর কাঠের পাটাতন দিয়ে বেশ কয়েকটি সাঁকো বানানো আছে। সাঁকো পার হয়ে আমরা বরফের কাছে চলে এলাম। জীবনে প্রথম প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে জমে থাকা বরফ দেখা ও ছোঁয়ার অভিজ্ঞতা, সে এক অসাধারণ ভালো লাগা। বরফের ওপর শুয়ে, বসে, হেঁটে কিছু সময় কাটালাম, ছবি তুললাম। স্বচ্ছ নীল আকাশ, শ্বেতশুভ্র বরফাচ্ছাদিত পর্বত, হিমেল হাওয়া। কনকনে ঠাণ্ডায় হাতের দস্তানা খুলে এক মিনিট থাকাও দুষ্কর। চমৎকার কিছু মুহূর্ত স্মৃতি করে নিলাম। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে মজা করে গাড়ির দিকে এগোলাম ফেরার জন্য। প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার ফুট উঁচু হওয়ায় এখানে অক্সিজেনস্বল্পতা রয়েছে, আমি কিছুটা সমস্যায় পড়েছিলাম। ইয়ামথান ফিরে আসার পর শ্বাস-প্রশ্বাস আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হলো।

অপরূপ দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা গ্যাংটকের উদ্দেশে রওনা দিই। সন্ধ্যায় পৌঁছালাম গ্যাংটক শহরে, ড্রাইভার আমাদের হোটেলের সামনে নামিয়ে দিলেন। এবার আমরা উঠেছি হোটেল চাংলো চেনে। এটি আগের হোটেলের চেয়ে অনেক ভালো হোটেল। ভাড়াও কম, ১ হাজার ২০০ রুপি। এটি এমজি মার্গের একটু পশ্চিমে নামনাম রোডে সিকিম লেজিসলেসিভ অ্যাসেম্বলি হাউস ও রোপওয়ের ঢালুতে অবস্থিত। আমরা রুমে প্রবেশ করে ফ্রেশ হয়ে বের হই এবং বেশ কিছুক্ষণ এমজি মার্গ ও লালবাজারে ঘোরাঘুরি এবং কিছু কেনাকাটা করে খান চাচাস কিচেনে চিকেন বিরিয়ানি খাই। বিরিয়ানিটা খুবই সুস্বাদু ছিল। খাওয়া শেষে আমরা হোটেলে ফিরে যাই এবং হোটেলের মালিকের সঙ্গে পরের দিনের জন্য সাংগু লেকের প্যাকেজ নিয়ে কথা বলতেই তিনি আমাদের ৩ হাজার ৫০০ রুপিতে পারমিটসহ সাংগু ট্যুর প্যাকেজ ঠিক করে দিলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কিছু অগ্রিম টাকা দিলাম। হোটেল মালিক জানিয়ে দিলেন, সকাল সাড়ে ৮টায় আমাদের সফর শুরু হবে। এবার রুমে গিয়ে ঘুমানোর পালা। ২০ নভেম্বর সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাশতা করে তৈরি হয়ে নিলাম সাংগু লেক ভ্রমণের জন্য। যথাসময়ে গাড়ি হাজির। আমরা চড়ে বসলাম। যাত্রা শুরু হলো সাংগু লেকের উদ্দেশে।

সাংগু যাওয়ার পথে চেকপোস্টে আমাদের পারমিট চেক হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর অনেকটা খাড়া পাহাড়ে খাঁজ কাটা পিচঢালা রাস্তা, নিচের দিকে তাকাতেই ভয় হচ্ছিল, তবু সবাই ভালোই মজা করছিলাম। মাঝে মাঝে রাস্তা ধসে যাওয়ার চিহ্ন রয়েছে, সেগুলো মেরামত হয়েছে। এভাবে কিছু চলার পর ফিফটিন মাইল নামক জায়গায় চলে আসি এবং এখানে স্বল্প সময়ের যাত্রাবিরতিতে সবাই নডুলস-স্যুপ খাই। তারপর আবার এগিয়ে চলা শুরু। সাংগুর রাস্তাটা লাচুংয়ের রাস্তার চেয়েও অ্যাডভেঞ্চারাস। সাংগু লেক পৌঁছে আমরা বিমোহিত। খুব সুন্দর স্বছ নীল পানির একটি লেক, প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় সৃষ্টিকর্তার এক অপার্থিব নিদর্শন। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে এই লেকের পানি প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বরফে রূপান্তরিত হয়। তখন সেখানে ভিন্ন আরেক রূপ তৈরি হয়। লেকের দুপাড়ে ঘোরাঘুরি করলাম, ছবি তুললাম। লেকের পাড়ে একটি মন্দির রয়েছে। পর্যটকদের আকর্ষণ বৃদ্ধির জন্য মন্দিরের পাশে অনেক পোষা চমরী গরু (ইয়াক) রেখেছে স্থানীয়রা। পর্যটকরা একগুলোতে করে চড়ে লেকের পাড়ে বেড়ায়, ছবি তোলে। একটি পর্বতের পাদদেশ থেকে কেবল কারে করে পর্বতের চূড়ায় উঠে ঘুরে আসা যায়, আগের দিন লাচুংয়ে অক্সিজেনসংকট অনুভব করায় অসুস্থ হওয়ার ভয়ে আজ কেবল কারে উঠিনি। যতটুকু সৌন্দর্য দেখতে পাই, তা মুখের ভাষায় পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ঘণ্টাখানেক বেড়িয়ে আবার গ্যাংটকের উদ্দেশে রওনা হই এবং দুপুরের মধ্যেই আমরা গ্যাংটক ফিরে আসি। ফিরে এসে আমরা আসলাম বিরিয়ানি থেকে বিফ বিরিয়ানি খেয়ে হোটেলে ফিরে রেস্ট নিই। বিকেল থেকে সন্ধ্যায় আমরা লালবাজারে ঘুরে কেনাকাটা করে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরে আসি। সিদ্ধান্ত নিলাম, এই কদিনের ভ্রমণ-ক্লান্তি দূর করতে আগামীকাল ঘুম না ভাঙা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমাব।

পরদিন ২১ নভেম্বর সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘড়িতে সাড়ে ৯টা। উঠে ফ্রেশ হয়ে নাশতা সেরে বের হলাম। দু-তিন মিনিট হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত সিকিমের লেজিসলেসিভ অ্যাসেম্বলি দেখে এলাম। ছোট্ট সুন্দর একটি অ্যাসেম্বলি ভবন, ২৫ জন সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসেন। ভূমিপুত্র হিসেবে ভারতের সাবেক ফুটবল দলের অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া সেখানে খুবই বিখ্যাত। পর্যটনবান্ধব একটি রাজ্য। এরপর গেলাম পাশেই অবস্থিত কেবল কারে চড়তে। টিকিট কেটে সারিবদ্ধ লাইনে আমরা উঠে পড়লাম কেবল কারে। ধীরে ধীরে কেবল কার চলতে শুরু করল, আর উন্মুক্ত হতে থাকল পাহাড়ি রাজ্য সিকিমের গ্যাংটক শহর-প্রকৃতি। প্রতিটি পাহাড়ের গায়ে তৈরি ঘরবাড়ি, গাছগাছালি খুব সুন্দর লাগছিল। অপর প্রান্তের নিচে কারুকার্যময় একটি প্রজাপতি স্ট্যাচু দেখে আমরা ফিরে এলাম। স্বল্প সময়ে ভালো রোমাঞ্চকর রাইড। এবার আমরা গ্যাংটক সিটি ট্যুরের জন্য ১ হাজার ৫০০ রুপিতে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করলাম। সিটি ট্যুরের অংশ হিসেবে আমরা হনুমানটক, গণেশটক, চিড়িয়াখানা (যদিও আমরা প্রবেশ করিনি), বোটানিক্যাল গার্ডেন, তাশি ভিউ পয়েন্ট, বাকতাং ওয়াটার ফল (এখানে জিপলাইনিং করেছি), রুমটেক মোনেস্ট্রি, সিকিম মিউজিয়াম ঘুরে এমজি মর্গে এসে খান চাচাস কিচেনে লাঞ্চ সারলাম।

তারপর বিকেল অবধি কেনাকাটা সেরে হোটেলে ফিরে লাগেজ গোছালাম। রাতের খাবার খেয়ে এমজি মার্গে শেষবারের মতো ঘুরে হোটেলে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন ফেরার পালা। ২২ নভেম্বর সকলে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাশতা সেরে হোটেল থেকে চেকআউট করে ২ হাজার রুপিতে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করলাম শিলিগুড়ির বাগডোগরা এয়ারপোর্টের উদ্দেশে। বাগডোগরা থেকে আমাদের কলকাতাগামী ফ্লাইট বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে, আর কলকাতা থেকে ঢাকার ফ্লাইট রাত সাড়ে ৯টায়। সিকিম ভারতের অন্যতম একটি পরিচ্ছন্ন রাজ্য। অপরাধ নেই বললেই চলে। স্থানীয়রা খুবই বন্ধুবৎসল ও পর্যটনবান্ধব। সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় সুস্থভাবে সুন্দর ও সঠিক পরিকল্পনায় সিকিম ভ্রমণ সম্পন্ন করেছি। সিকিমের অনন্যসুন্দর মুহূর্তগুলোর জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ।

লাইফস্টাইল বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]

সাম্প্রতিক

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্য ১৭ এপ্রিল

প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্য ১৭ এপ্রিল

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

রিজভীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি

রিজভীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি

চলে গেলেন মিতা হক

চলে গেলেন মিতা হক

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

কফি হাউসের আড্ডায়

কফি হাউসের আড্ডায়

রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সূচনাভূমি মুজিবনগর

রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সূচনাভূমি মুজিবনগর

মৃৎপল্লিতে একদিন...

মৃৎপল্লিতে একদিন...

শিমুলের লাল আভায় একদিন

শিমুলের লাল আভায় একদিন