সব
বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮

সন্ত্রাসী রাজনীতি ও মাদ্রাসাশিক্ষা

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ১০:০০
গত ১৭ মার্চ থেকে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী হেফাজতে ইসলামের সন্ত্রাসীদের যে নারকীয় তাণ্ডব আমরা দেখেছি, তাতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেভাবে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাস চালিয়েছে, তা নজিরবিহীন। কিন্তু এই শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাই করে ধর্মের নামে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে মামুনুল-বাবুনগরী গং

এই মহামারির সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রায় সবাই শঙ্কিত। নানা সময়ে নানাবিধ আলোচনা হচ্ছে এ নিয়ে। অনেকেই বলছে- ‘করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কেন খুলছে না? ছেলেমেয়েরা পড়ালেখায় পিছিয়ে যাচ্ছে। ঘরে বসে থেকে তারা বিষণ্নতায় ভুগছে। অনেক শিশু-কিশোর নানা রকম ডিভাইসে বেশি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। ইউটিউব দেখে কার্টুনের ভাষায় কথা বলছে। ঘরের মানুষের সঙ্গে কথা না বলে কথা বলছে কার্টুন চরিত্রের সঙ্গে। এ রকম নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে স্কুল বন্ধ থাকায়।’ কিন্তু করোনার বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করেই সরকার যৌক্তিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখছে। ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলো বন্ধ এক বছরের বেশি সময় ধরে। তাদের কারো কারো অনলাইন ক্লাস চলে। যাদের সাধ্য নেই, তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ। শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের নিরাপত্তা আর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

কিন্তু সতর্কতা অবলম্বনের মধ্য দিয়ে করোনা থেকে মুক্ত থাকার প্রয়াস কি শুধু বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করা শিক্ষার্থীদের জন্যই প্রয়োজন? আরেকটি শিক্ষার ধারা যে বাংলাদেশে আছে,  মাদ্রাসাশিক্ষা; তাদের কি সুস্থ থাকা বা করোনামুক্ত থাকার প্রয়োজন নেই? তারা কি অন্য কাউকে সংক্রমিত করতে পারে না? তবে কী করে এই মহামারিকালেও মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের নিয়ে পথে নামছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষগুলো। ছোট ছোট শিশুদের এই করোনা মহামারির সময়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো।

এই করোনার সময়েই বেশ কয়েকবার দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর হয়ে উঠেছে। মাদ্রাসার শিক্ষক কর্তৃক কখনো নারী-শিক্ষার্থী ধর্ষণ করে খুন করা, কখনো দিনের পর দিন পুরুষ-শিশু ধর্ষণ করা। কখনো পশুর মতো পিটিয়ে মারা। কখনো মায়ের কাছে যেতে চাওয়ায় নির্মম প্রহারের দৃশ্য ভাইরাল হওয়ায় জানতে পারলাম, মাদ্রাসাগুলো এই মহামারির সময়ও বন্ধ হয়নি। চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে সম্মেলনও হতে দেখলাম। দেখলাম করোনাসংক্রান্ত সরকারি স্বাস্থ্যবিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব দেখার যেন কেউ নেই!

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্কের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত নিয়মাবলি রয়েছে। মাদ্রাসাগুলোতে পাঠ্যক্রমই যেখানে অনুসরণ করা হয় না, সেখানে শিক্ষার্থীর সঙ্গে আচরণের নিয়ম মানা হবে, তা চিন্তা করাও আকাশ-কুসুম কল্পনা। শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করা, নানাভাবে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করা যেন মাদ্রাসার সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো পর্যবেক্ষণ আছে কি না, আমার জানা নেই। অন্যদিকে সাধারণ স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের একটু বকলেও কিন্তু রিপোর্ট হয়ে যায়। বেশিভাগ ক্ষেত্রেই এসব মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা নিম্নবিত্ত শ্রেণির এবং প্রভাবশালী নন বলে সন্তানদের এই নির্যাতনের প্রতিবাদও করতে পারেন না। দরিদ্র ঘরের শিশুরা দিনের পর দিন মার খেয়ে, ধর্ষিত হয়ে পড়ে থাকে মাদ্রাসায়। আমরা নিশ্চয়ই ফেনীর নুসরাতের কথা ভুলে যাইনি। যাকে ধর্ষণ করে মাদ্রাসার ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিল।

২০১৩ সালে আমরা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে দেখেছিলাম শিশুশিক্ষার্থীদের ধর্মের জিহাদের নামে নিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল পুলিশের। উগ্র মৌলবাদীদের শক্তিতে বলীয়ান এসব মাদ্রাসা জাতীয় শিক্ষাক্রমকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের নিয়মে নিজেদের নির্ধারিত বিষয়গুলো পাঠ করায়। বাংলা, ইংরেজি পড়ায় না। এমনকি জাতীয় সংগীতও গায় না। এসব শিশু বাংলাদেশের সংবিধান বা মুক্তিযুদ্ধকে সম্মান করবে না, এ তো স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায়। তারা এ দেশে জাতীয় সংগীতের বিরুদ্ধে কথা বলছে, জাতির জনককে অসম্মান করছে; কারণ সঠিক শিক্ষাই তারা পায়নি তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, শিক্ষকদের কাছ থেকে। ফলে এসব মাদ্রাসার অধিকাংশই জঙ্গি তৈরির কারখানা হয়। এখানে অস্ত্রশিক্ষাও দেয়া হয়। একসময় এসব মাদ্রাসা থেকেই আফগানিস্তানে জিহাদ করতে পাঠানো হয়েছিল যাদের, তারাই পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটিয়েছে। বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক হামলা করতে ব্যবহৃত হয় এই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এখনো এই মাদ্রাসা থেকে মগজ ধোলাই করে হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি, আনসার-আল-ইসলামসহ নানা জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য সরবরাহ করা হয়। এতে কত কত তরুণ প্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে, তার হিসাব নেই। পরিবার হারাচ্ছে তার সন্তান। রাষ্ট্র হারাচ্ছে তার মর্যাদা।

গত ১৭ মার্চ থেকে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী হেফাজতে ইসলামের সন্ত্রাসীদের যে নারকীয় তাণ্ডব আমরা দেখেছি, তাতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেভাবে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাস চালিয়েছে, তা নজিরবিহীন। কিন্তু এই শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাই করে ধর্মের নামে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে মামুনুল-বাবুনগরী গং।

ভুলভাবে, ভুল পথে চলমান এই মাদ্রাসাশিক্ষার কারণে যে মৌলবাদী গোষ্ঠীর কর্মী তৈরি হচ্ছে, তাদের হাতেই সম্পূর্ণভাবে বিনাশ হবার পথে দেশের সার্বিক মর্যাদা। আমরা কি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পরিস্থিতি দেখছি না? জঙ্গিবাদের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এদের মাদ্রাসাগুলো। ফলে রাষ্ট্র হিসেবে এ দুটি দেশ এখন প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে।

যে অবস্থা চলছে, তা চলতে থাকলে বিশ্বে আমাদের পরিচয় বদলে যেতে আর খুব দেরি নেই। এখন আর সতর্ক হওয়ার সময় নেই। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

 

লেখক: শিশু সাহিত্যিক, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী

সারাক্ষণ মতামতের বৈচিত্র্যে বিশ্বাস করে। এই লেখার বিষয়ে কারো যদি কোন ভিন্নমত থাকে তাহলে অনূর্ধ্ব ৪০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান আমাদের কাছে। সারাক্ষণ আপনার ভিন্নমত সাদরে গ্রহণ করবে। আপনার ভিন্নমত প্রকাশ হবে পাঠকের অভিমত কলামে। সঙ্গে আপনার নাম, সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাবেন, যা আপনার লেখার সঙ্গে প্রকাশ হবে। ভিন্নমত পাঠানোর ই-মেইল : ‍[email protected]
মতামত বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]
নাম হবে মাওলানা মামুনুল হক রিসোর্ট !
মুহম্মদ শফিকুর রহমান

নাম হবে মাওলানা মামুনুল হক রিসোর্ট !

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ
ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ

মামুনুল হক: ধর্মব্যবসায়ীর কুৎসিত চেহারা
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

মামুনুল হক: ধর্মব্যবসায়ীর কুৎসিত চেহারা