সব
রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ২৮ চৈত্র ১৪২৭

এই লকডাউনেও কি গরিব পাবে দৈনিক ১৪ গ্রাম চাল আর ১১ পয়সা?

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ১১:২৪
এক সপ্তাহের লকডাউন কোনোভবেই বৈজ্ঞানিক নয়, কারণ করোনার জীবাণুর ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১৪ দিন। লকডাউন কমপক্ষে ১৪ দিন হতে হয়। এর চেয়েও বেশি হওয়া ভালো। সরকারি পরিপত্রে জানানো হয়েছে, দেশের সব কলকারখানা চালু থাকবে। এমনকি চালু থাকবে বইমেলাও। তাহলে সরকারের ভাষায়ও যেটা ‘কঠোর বিধিনিষেধ’, সেটা আদৌ কতটা প্রভাব ফেলবে করোনা নিয়ন্ত্রণে?

করোনা নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে এবারও ‘লকডাউন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে ‘কঠোর বিধিনিষেধ’। গত বছরও ছিল এমন তথাকথিত সাধারণ ছুটি। এবারের পদক্ষেপের আদৌ কি কোনো কার্যকর প্রভাব আমরা করোনা মোকাবিলায় দেখতে পাব?

কোনো সন্দেহ নেই করোনা পরিস্থিতি যথেষ্ট ভয়ংকর দিকে চলে গেছে এর মধ্যেই। এ দেশের সরকারের দেয়া তথ্য-উপাত্তে মানুষের আস্থা নেই বহুদিন যাবৎ। তবু সরকারি ডেটা অনুযায়ী এখনই নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তকরণের হার প্রায় ২৫ শতাংশ। যেহেতু আমাদের টেস্ট করার সংখ্যা অনেক কম এবং এখন অনেকেই নানা কারণে স্ক্রিনিংয়ের জন্য পরীক্ষা করাচ্ছেন, তাই শনাক্তকরণের হার নিশ্চয়ই হবে আরো অনেক বেশি।

গত বছর করোনা শুরুর সময় থেকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় যাওয়া রোগীর পক্ষে একটি ন্যাজাল ক্যানুলা দিয়ে উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন কিংবা আইসিউ বেড পাওয়া ছিল অকল্পনীয় ও কঠিন। আর এখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে এসে সেটা একেবারে ভয়ংকর কল্পনা-বিলাসে পরিণত হয়েছে। সরকারি পরিপত্রের বাইরেও আমরা মূলধারার মিডিয়ায় এবং সামাজিক মাধ্যমে দেখছি, স্রেফ একটা বেডের জন্য মানুষ এখন হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছে এবং অনেকেই মারা যাচ্ছে অ্যাম্বুলেন্সেই। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে অক্সিজেনের জন্য হাঁসফাঁস করা রোগী আর মৃত স্বজনের করুণ ছবি এখন মিডিয়ার নিত্যকার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

 

গত বছর যাবতীয় অব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকার বারবার বলেছে, এই প্যান্ডামিক একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা, তাই কিছু অব্যবস্থাপনা অস্বাভাবিক না। আজ এক বছর পরেও দেখা যাচ্ছে একই চিত্র- সীমাহীন অদক্ষতা, অযোগ্যতা, অব্যবস্থাপনা আর সমন্বয়হীনতা। কোনো ক্ষেত্রেই ন্যূনতম কোনো উন্নতি হয়নি। যার মাশুল দিচ্ছে সাধারণ জনগণ, তাদের তো আর ভিআইপিদের মতো শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল কিংবা সিএমএইচের মতো কোনো নির্ধারিত হাসপাতাল নেই।

বিদ্যমান ভয়ংকর পরিস্থিতিতে রোগীর সংখ্যা এভাবে বাড়তে থাকলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে অচিরেই। তাই সংক্রমণের পরিমাণ যেকোনো মূল্যে কমিয়ে আনতে হবে। যৌক্তিকভাবেই দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্বল্প সময়ের জন্য হলেও একটা কঠোর লকডাউন দিতে বারবার পরামর্শ দিয়েছেন।

শুরুতেই বলেছি সরকার ‘লকডাউন’ শব্দটি ব্যবহার করেনি এবং এর মধ্যে আরো কিছু বিষয় আছে, যা একেবারে হাস্যকর। এক সপ্তাহের লকডাউন কোনোভবেই বৈজ্ঞানিক নয়, কারণ করোনার জীবাণুর ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১৪ দিন। লকডাউন কমপক্ষে ১৪ দিন হতে হয়। এর চেয়েও বেশি হওয়া ভালো। সরকারি পরিপত্রে জানানো হয়েছে, দেশের সব কলকারখানা চালু থাকবে। এমনকি চালু থাকবে বইমেলাও। তাহলে সরকারের ভাষায়ও যেটা ‘কঠোর বিধিনিষেধ’, সেটা আদৌ কতটা প্রভাব ফেলবে করোনা নিয়ন্ত্রণে?

এ দেশে যখনই লকডাউনের প্রসঙ্গ আসে, তখনই ভেতরে ভয়ংকর আতঙ্কিত বোধ করি। কয়েক সপ্তাহের একটা লকডাউন এই সমাজের কিছু মানুষ হয়তো সহ্য করতে পারেন; কিন্তু সবাই নয়। আর পারতে পারেন সরকারি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে ওঠা কিছু মানুষ! এ লেখা যখন লিখছি, তখন মিডিয়ায় দেখছি নিউমার্কেট এবং বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে লকডাউনের প্রতিবাদ করছেন। এই মানুষদের কথা কি ভাবছি আমরা?

দেশের কিছু ব্যবসা সারা বছর চললেও পোশাক এবং অন্যান্য এক্সেসরিজের যে ব্যবসা, তার প্রধান অংশটি হয় ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে। গত বছরও তাদের এই ব্যবসা হয়নি। এই বছরও যদি সেটা না হয়, তাহলে পরিস্থিতি কেমন হতে পারে? এসব ব্যবসার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে আরো অনেক ব্যবসা; তাদের কী হবে? খুঁজলে দেখা যাবে, এই আপাত লকডাউনে বিপদে পড়বে এমন আরো অনেক মাঝারি থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসা। ব্যবসার মালিক বিপদে পড়া মানে এই খাতে কাজ করা কোটি কোটি শ্রমিকও বিপদে পড়া।

গত বছরই করোনার প্রভাব ভয়ংকরভাবে পড়েছে এ দেশের প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপরে। তথাকথিত সাধারণ ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পরে অর্থনীতিবিষয়ক থিংকট্যাংক সানেম গবেষণার মাধ্যমে জানিয়েছিল, দেশের এই মুহূর্তে দরিদ্র মানুষের অনুপাত ৪২ শতাংশ, যা করোনা-পূর্ব সময়ের দ্বিগুণ। এই মানুষগুলো এখনকার লকডাউনে কী করবে?

লকডাউনের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ে দরিদ্র মানুষের ওপর, যারা দিন আনে দিন খায়। সে জন্যই খুব কঠোর লকডাউনের সময় সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে এই মানুষগুলোর কাছে খাদ্য এবং অর্থ-সহায়তা পৌঁছে দেয়া; যাতে তারা মোটামুটিভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচন ছাড়া ‘অবৈধভাবে’ ক্ষমতায় আছে গত ৭ বছর। করছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট, তীব্র মানবাধিকার লঙ্ঘন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণসহ নানা রকম ভয়ংকর অপরাধ। এই সবকিছুকে জায়েজ করার জন্য তারা ক্রমাগত চালায় উন্নয়নের প্রপাগান্ডা। আমাদের নিয়মিত জানানো হয়, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হয়েছে, মাথাপিছু আয় কত বেড়েছে, এসব তথ্য-উপাত্ত। এই তথাকথিত উন্নয়নের মহাসড়কে বিপুল গতিতে ধাবমান বাংলাদেশ গত বছরের সাধারণ ছুটির সময় তার অভুক্ত প্রান্তিক নাগরিকদের জন্য কী করেছিল?

সরকারি প্রেসনোট অনুযায়ী গত বছরের ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পর থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত তিন মাসে সারা দেশে বিতরণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৮৯ মেট্রিক টন চাল। উপকারভোগী লোকসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১১ লাখ ১৮ হাজার ৯৫২ জন। অর্থাৎ তিন মাসে একজন মানুষ গড়ে চাল পেয়েছিল ২ দশমিক ৬২ কেজি। প্রতিদিনের হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৫৫ গ্রাম।

এই তিন মাসে সাধারণ ত্রাণ হিসেবে নগদ বিতরণ করা হয়েছিল ৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ৫২ হাজার ৬৩৩ টাকা। উপকারভোগী লোকসংখ্যা ছিল ৪ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার ৪৭৩ জন। অর্থাৎ তিন মাসে একজন মানুষ গড়ে আর্থিক সাহায্য পেয়েছিল ২০ দশমিক ৫৮ টাকা। প্রতিদিন এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৩৮ পয়সা।

হ্যাঁ, সরকারি প্রেসনোট অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৪ দশমিক ৫৫ গ্রাম চাল আর ১১ দশমিক ৩৮ পয়সা বরাদ্দ পেয়েছে।

করোনার সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে পোশাকশিল্পের মালিকসহ বৃহৎ শিল্পমালিকরা একের পর এক অর্থ-সাহায্য পেয়ে গেছেন, কিন্তু অতি সামান্য বরাদ্দ পেয়েছে ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং কুটিরশিল্প। একই কথা প্রযোজ্য কৃষকদের ক্ষেত্রেও। এভাবেই এই সরকার থেকে গেছে গুটিকতক মানুষের।

সামনে একটি ‘কঠোর বিধিনিষেধ’, সেটা হয়তো বাড়বে আরো। অতীত অভিজ্ঞতা বলে এমন ঢিলেঢালা পদক্ষেপ করোনা সংক্রমণ কমাতে তেমন কার্যকরী হবে না, বরং সেটা দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস তুলে দেবে। 

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট; জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য ও বিএনপিদলীয় হুইপ

সারাক্ষণ মতামতের বৈচিত্র্যে বিশ্বাস করে। এই লেখার বিষয়ে কারো যদি কোন ভিন্নমত থাকে তাহলে অনূর্ধ্ব ৪০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান আমাদের কাছে। সারাক্ষণ আপনার ভিন্নমত সাদরে গ্রহণ করবে। আপনার ভিন্নমত প্রকাশ হবে পাঠকের অভিমত কলামে। সঙ্গে আপনার নাম, সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাবেন, যা আপনার লেখার সঙ্গে প্রকাশ হবে। ভিন্নমত পাঠানোর ই-মেইল : ‍[email protected]
মতামত বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]

জনপ্রিয়

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

চলে গেলেন মিতা হক

চলে গেলেন মিতা হক

বাতিলই হলো পাকিস্তানের বাংলাদেশ সফর

বাতিলই হলো পাকিস্তানের বাংলাদেশ সফর

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

অপু উকিল করোনায় আক্রান্ত

অপু উকিল করোনায় আক্রান্ত

উত্তরায় ট্রেনের ধাক্কায় অটোচালকের মৃত্যু

উত্তরায় ট্রেনের ধাক্কায় অটোচালকের মৃত্যু

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

জেএমবির শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার

জেএমবির শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ
ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ

মামুনুল হক: ধর্মব্যবসায়ীর কুৎসিত চেহারা
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

মামুনুল হক: ধর্মব্যবসায়ীর কুৎসিত চেহারা

টাইম ম্যানেজমেন্ট, নাকি টাইম প্রায়োরাটাইজেশন?
জিয়া হাসান

টাইম ম্যানেজমেন্ট, নাকি টাইম প্রায়োরাটাইজেশন?

লেবাসধারীদের জন্য কি সবকিছুই জায়েজ?
প্রভাষ আমিন

লেবাসধারীদের জন্য কি সবকিছুই জায়েজ?