সব
রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ২৮ চৈত্র ১৪২৭
AD

আমি বেগমবাজারের মেয়ে-২৭

চড়কে বৈশাখে

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২১, ১৫:০০
বদলে গেছে বন্ধুদের চেহারা। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে এসে সংবাদপত্রে যোগ দেয়ার পর কলিগরাই হয়ে গেছেন বন্ধু। ১৯৯৭ সালে শাহিন রিজভি আর আমি বেশ রোমান্টিক একটি পহেলা বৈশাখ কাটিয়েছি। ১৪০০ সালের পর অনেক বছর পার হয়েছে। তবু এখনো মনে পড়ে যায় সেই বৈশাখ, অনেক বছর আগের সেই তরুণবেলা

পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত যে মধুর স্মৃতি। বাংলাদেশে আবহমান কাল থেকেই চৈত্রসংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখে নববর্ষ পালনের রীতি ছিল। চৈত্র-বৈশাখ মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মেলা বসত। চড়ক পূজার আয়োজনও হতো। তবে ঢাকায় শহুরে আমেজে নতুন করে নবর্ষ উদযাপনের রীতি শুরু হয় ষাটের দশকে। পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির সংস্কৃতিকে মুছে দিতে চেয়েছিল। মূলত সেই প্রতিবাদ থেকেই পহেলা বৈশাখকে শহরে উদযাপনের রীতি শুরু হয়।

ঢাকায় মোগল ও ইংরেজ আমলেও পহেলা বৈশাখ পালন করা হতো। পুণ্যাহ ও হালখাতা অনুষ্ঠান তো ছিলই। সেই সঙ্গে ষাঁড়ের লড়াই, নৌকাবাইচ ইত্যাদির রীতিও ছিল। আর ঢাকার আশপাশের গ্রামেও চৈত্র ও বৈশাখ মাসে গ্রামীণ মেলা বসত।

সত্তর ও আশির দশকে ঢাকায় পহেলা বৈশাখ মোটামুটি উৎসবমুখরভাবে পালন করা হতো। তবে তখনো মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রচলন হয়নি। মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে।

ষাটের দশকের শেষ দিকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় সন্‌জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে ছায়ানট রমনায় বর্ষবরণ শুরু করে।

এখানে আমি যে কথাটা স্পষ্ট করে বলতে চাচ্ছি, তা হলো পহেলা বৈশাখ কোনো হালের বিষয় বা আরোপিত বিষয় নয়। বর্ষবরণ চিরকালই বাংলাদেশে ছিল। কিন্তু ঢাকা মহানগরীতে শহুরেভাবে বৈশাখবরণ জিয়া ও এরশাদ আমলে তেমন জোরেশোরে হয়নি।

পহেলা বৈশাখের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হালখাতা। ছোটবেলায় হালখাতার নিমন্ত্রণ পেতাম অনেক। শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার এলাকায় অনেক পরিচিত সোনার দোকান থেকে আসত দাওয়াতের চিঠি। হালখাতার দাওয়াতে যাওয়া হতো বাবার বন্ধুদের দোকানে। এর মধ্যে একজন ছিলেন স্মৃতি জুয়েলার্সের মালিক। ভদ্রলোকের নাম ভুলে গিয়েছি। হালখাতার নিমন্ত্রণে গিয়ে দেখতাম দোকান সাজানো হয়েছে শোলা ও ফুল দিয়ে। গণেশের বিগ্রহে সিঁদুর লেপা। সামনে ধূপকাঠি। সেদিন স্পেশাল মিষ্টি খাওয়ানো হতো। বড় বড় রাজভোগ, মতিচুরের লাড্ডু, লালমোহন, ছানার জিলাপি থাকবেই।

হালখাতার দাওয়াতে হিন্দু-মুসলমানের কোনো বিষয় ছিল না। মুসলমান ব্যবসায়ীরাও সমান উৎসাহ নিয়ে হালখাতা করতেন। আমার বেশ মনে পড়ে, যেসব জুয়েলার্সের মালিক মুসলমান, তাদের কাছ থেকেও আমরা হালখাতার কার্ড পেতাম।

সত্তর ও আশির দশকের পহেলা বৈশাখের কথা মনে পড়ে। তখন রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানটি হতো।

প্রতিবছর যেতে না পারলেও অধিকাংশ বছরই আমরা যেতাম।

বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে, শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণে বেশ কয়েকবার বৈশাখী মেলা হয়েছে। প্রতিবারই গিয়েছি।

ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের বাড়িতে সব সময় পহেলা বৈশাখ পালন করা হতো। এর কারণ হলো বাবার ক্যালেন্ডারবিষয়ক গবেষণা। বাবা বর্ষপঞ্জির গবেষক। তাই পহেলা বৈশাখের ইতিহাস তার কাছে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।

সে সময় আমাদের বাড়িতে পহেলা বৈশাখে পোলাও-মাংস রান্না হতো। আর মা অতি অবশ্যই পায়েস রান্না করতেন। আত্মীয় বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে যাওয়াও হতো।

মঙ্গল শোভাযাত্রা যখন শুরু হলো চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে, তখন থেকেই তাতে অংশ নেয়া শুরু করি। নব্বইয়ের দশকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ১৯৮৯ সালে ভর্তি হই লোকপ্রশাসন বিভাগে অনার্স শ্রেণিতে। সে সময় তাই পহেলা বৈশাখ পালন করেছি দারুণ আনন্দে। বলতে গেলে আমার তরুণবেলার মধুর সব স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পহেলা বৈশাখ।

 

নব্বই দশকে এক বৈশাখে

নব্বইয়ের দশক থেকেই ঢাকায় পহেলা বৈশাখের ব্যাপক ও জৌলুশময় আয়োজন শুরু, এ কথা অবশ্যই বলা যায়।

আমাদের পাঠ্যবইতে ‘১৪০০ সাল’ নামে রবীন্দ্রনাথের বহুল পরিচিত কবিতাটি ছিল। ১৯৯৩ সালে সবার খেয়াল হলো, আরে এই তো সেই বিখ্যাত ১৪০০ সাল। রীতিমতো রোমাঞ্চকর ঘটনা। যে সালটির কথা রবীন্দ্রনাথ তার কবিতায় লিখেছেন, যেটি মুখস্থ করে, প্রশ্ন উত্তর ও ব্যাখ্যা লিখতে লিখতে প্রাণান্ত হতে হয়েছে, সেই ১৪০০ সাল কি না দরজায় হাজির। বিনা অভ্যর্থনায় তাকে যেতে দেয়া কোনোমতেই সম্ভব না। ইয়ার্কি নাকি?

শুরু হলো ব্যাপক তোড়জোড়।

আমি তখন লোকপ্রশাসনে পড়ার পাশাপাশি ভাষা ইনস্টিটিউটে জার্মান ভাষা শিখছি। ইনস্টিটিউটের পরিচালক তখন ড. মনসুর মুসা। তিনি দাদার ছাত্র এবং বাবার বেশ বন্ধুস্থানীয় মানুষ। সেই সূত্রে আমাকে অনেক স্নেহ করেন। ভাষা ইনস্টিটিউট থেকে সিদ্ধান্ত হলো নববর্ষ পালন করতে হবে। সে সময় আবিষ্কার হলো যে, কাজী নজরুল ইসলামেরও একটি ১৪০০ সাল কবিতা রয়েছে; যেটি মূলত রবীন্দ্রনাথের কবিতাটির উত্তর। সেখানে নজরুল কবিগুরুকে আশ্বস্ত করছেন যে বাঙালির ভাবের ঘরে রবীন্দ্রনাথই এখনো পর্যন্ত স্বমহিমায় বিরাজমান। অনুষ্ঠানে এই দুটি কবিতা অবশ্যই পড়তে হবে। সেই সঙ্গে থাকবে বিভিন্ন ভাষায় নববর্ষকে আবাহন। বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা বাংলায় গাইবে এসো হে বৈশাখ ও অন্যান্য গান।

 

চীনে ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীদের সঙ্গে বৈশাখ উদযাপন

নাচও পরিবেশিত হবে। স্থির হলো, আমি এবং বাংলা বিভাগের চীনা ছাত্রী ইয়ু কুয়াং ইউয়ে (বর্তমানে তিনি চায়না মিডিয়া গ্রুপের বাংলা বিভাগের পরিচালক, তার বাংলা নাম আনন্দী) যৌথভাবে ১৪০০ সাল কবিতাটি আবৃত্তি করব দুই ভাষায়। আর নজরুলের কবিতাটি আমি একাই আবৃত্তি করব।

বেশ কথা। শুরু হলো রিহার্সাল। প্রতিদিন মহড়ার সময় বিভিন্ন বিভাগের ছাত্রছাত্রী মিলে বেশ মজা হতে লাগল। আমার পাবলিক অ্যাডের লেখাপড়া শিকেয় উঠল বলা চলে। ইয়ু কুয়াং ইউয়ের সঙ্গে সেই আমার আলাপ। এর ১৮ বছর পর তার সঙ্গে আবার দেখা হয় বেইজিংয়ে।

নববর্ষের দিন অনুষ্ঠান আশাতীতভাবে ভালো হলো, জমেও গেল। বিশেষ করে বিদেশি তরুণ-তরুণীদের মুখে বাংলা গানটান শুনে দর্শক মাতোয়ারা। অনুষ্ঠান শেষে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বের হলাম বৈশাখী মেলা দেখতে। বাংলা একাডেমিতে মেলা হচ্ছিল। সে বছর বোধ হয় ধানমন্ডি মাঠেও বৈশাখী মেলা হয়েছিল। যা হোক, বেশ ঘোরাঘুরি হলো। নাগরদোলাতেও চড়লাম।

সপরিবারে বাংলা একাডেমির বৈশাখী মেলায়

পহেলা বৈশাখ নব্বইয়ের দশকে সর্বজনীন রূপ পেতে শুরু করে। কয়েক বছরের মধ্যেই পুরো ঢাকা শহরের জন্য এটাই প্রধান জন-উৎসবে পরিণত হয়। কারণ পূজায় পূজামণ্ডপে আমার মতো অহিন্দু কয়েকজন গেলেও ঈদে তো আর দল বেঁধে কোথাও যাওয়ার তেমন জায়গা নেই। ঈদের সময় যার যার পরিবারে ও বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে আয়োজন। ঢাকা ফাঁকাও হয়ে যায় সেসব উৎসবে। কিন্তু বৈশাখবরণ উৎসবে রমনার বটমূল, মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা- সব মিলিয়ে জমজমাট। ১৪০০ সালের পর প্রায় প্রতিবারই বৈশাখী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে রমনা, শাহবাগ, চারুকলায় প্রচুর মজা করেছি।

 

 প্রেসক্লাবে পহেলা বৈশাখ

 

বদলে গেছে বন্ধুদের চেহারা। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে এসে সংবাদপত্রে যোগ দেয়ার পর কলিগরাই হয়ে গেছেন বন্ধু। ১৯৯৭ সালে শাহিন রিজভি আর আমি বেশ রোমান্টিক একটি পহেলা বৈশাখ কাটিয়েছি। ১৪০০ সালের পর অনেক বছর পার হয়েছে। তবু এখনো মনে পড়ে যায় সেই বৈশাখ, অনেক বছর আগের সেই তরুণবেলা।

 

শিল্প ও সাহিত্য বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]
AD

সাম্প্রতিক

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্য ১৭ এপ্রিল

প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্য ১৭ এপ্রিল

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

রিজভীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি

রিজভীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি

চলে গেলেন মিতা হক

চলে গেলেন মিতা হক

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

কর্পাস ক্রিস্টি, টেক্সাস: বারো

কর্পাস ক্রিস্টি, টেক্সাস: বারো

কর্পাস ক্রিস্টি, টেক্সাস: এগারো

কর্পাস ক্রিস্টি, টেক্সাস: এগারো

শবেবরাতের জৌলুশ

শবেবরাতের জৌলুশ