সব
বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮
DBBL Ad

ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুর কারণ

দুই মহাদেশের মানুষের জেনেটিক মিল

বাংলার গৌরবময় উত্তরাধিকার গঙ্গাঋদ্ধি সভ্যতা

পলিবাহিত গঙ্গার মাধ্যমে ঋদ্ধি বা সমৃদ্ধি এসেছিল বলে এর নাম গঙ্গাঋদ্ধি হয়। তবে আরেকটি মত হচ্ছে, গঙ্গার ঠিক মাঝে এই সভ্যতার কেন্দ্র বা ‘রাজধানী’ ছিল বলে একে ‘গঙ্গার হৃদয়’ বলা হতো।

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২১, ১৫:০০

গঙ্গাঋদ্ধি প্রাচীন বাংলা সভ্যতার অন্যতম অংশ। গঙ্গা নদী যেটা বাংলাদেশ অংশে পরবর্তী কালে পদ্মা নমে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে, সেই নদীর কাছ ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ এক বিশাল রাজ্য-গঙ্গাঋদ্ধি। পলিবাহিত গঙ্গার মাধ্যমে ঋদ্ধি বা সমৃদ্ধি এসেছিল বলে এর নাম গঙ্গাঋদ্ধি হয়। তবে আরেকটি মত হচ্ছে, গঙ্গার ঠিক মাঝে এই সভ্যতার কেন্দ্র বা ‘রাজধানী’ ছিল বলে একে ‘গঙ্গার হৃদয়’ বলা হতো। সেখান থেকে পরিবর্তিত হয়ে গঙ্গারিডি, গঙ্গারিডাই, গঙ্গারিরি ইত্যাদি নাম প্রচলিত হয়।
প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন ইতিহাসবিদগণ সবচেয়ে বেশি এই অঞ্চলটির কথা লিখে গিয়েছেন। এই অঞ্চলটি নিয়ে তাদের আগ্রহের কারণও ছিল। এখানেই গ্রিক বীর আলেকজান্ডার যিনি বাংলার মানুষের কাছে ‘সেকান্দার’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন, তিনি তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় মেনে যমুনা নদীর পশ্চিম পাড় থেকেই সদলবলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস তার ইন্ডিকা বইটিতে লিখেছেন, ‘গঙ্গা নদী উত্তর হতে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত এবং গঙ্গারিডাই রাজ্যের পূর্ব সীমানায় সমুদ্রে মিলিত হয়েছে।’
তার মতের সমর্থন পাওয়া যায় প্লিনির লেখায়। তিনি জানিয়েছেন, ‘গঙ্গারিডাই রাজ্যের ভেতর দিয়ে গঙ্গা নদীর শেষ অংশ প্রবাহিত হয়েছে।’
গঙ্গাঋদ্ধি সম্পর্কে দ্বিতীয় খ্রীষ্টাব্দে বিস্তারিত লিখেছেন টলেমি। তিনি জানিয়েছেন, ‘গঙ্গা নদীর মোহনায় পুরো এলাকা জুড়েই গঙ্গারিডাই রাজ্য’।
তিনি আরো ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ৩০০ খ্রীষ্টপূর্বে বাংলা অঞ্চলে গঙ্গাঋদ্ধির অবস্থান ছিল। গঙ্গা নদীর পাঁচটি বড় ‘মুখ’ বা নদীর শাখার পাশের পুরো এলাকা জুড়েই গঙ্গারিডাইদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। টলেমি বর্ণিত বিবরণে যে চারটি দ্রাঘিমা ডিগ্রির অবস্থান জানা যায় তাতে এই অঞ্চলটি বঙ্গোপসাগরের উপকূলের সবচেয়ে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকের নদীমুখ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পরবর্তীকালে গবেষকগণ দেখেছেন যে, বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের তমলুক এলাকায় ভাগীরথি নদী এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের কাছে প্রবাহিত পদ্মা দ্রাঘিমা রেখার পার্থক্য ৩৫ ডিগ্রির কিছু বেশি। সেই হিসাবে টলেমি বর্ণিত গঙ্গারিডাই বর্তমান পশ্চিম বঙ্গ ও বাংলাদেশে প্রবাহিত গঙ্গার দুটো শাখার মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত ছিল।
মানচিত্রে ৩২৩ খ্রীষ্টপূর্বে প্রাচীন নন্দ রাজত্ব এবং এর পাশে গঙ্গাঋদ্ধির যে অবস্থান চিহ্নিত হয়েছে তাতে দেখা যায় যে, মূলত বর্তমান বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকা জুড়ে গঙ্গাঋদ্ধির সাহসী ও অগ্রসর মানুষেরা বসবাস করতেন। বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলের মধ্যেই যে গঙ্গাঋদ্ধি অবস্থিত সে বর্ণনা আরো দিয়েছেন ডিওডারাস, কার্টিয়াস, প্লুকার্ত, সলিনাস, স্ট্যাবো প্রমুখ।
কিছুদিন আগে পর্যন্ত গবেষকগণ চব্বিশ পরগণার চন্দ্রকেতুগড়কে গঙ্গাঋদ্ধির নতুন ভাবে খুঁজে পাওয়া একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করতেন। কেউ মনে করছেন চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গাঋদ্ধির ‘রাজধানী’ ছিল। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন, বর্তমানে কোনো দেশের রাজধানীর যে কনসেপ্ট বা ধারণা আছে সেভাবে প্রাচীন কালে রাজধানীকে বিবেচনা করা হতো না। রাজা, বাদশা বা প্রশাসকরা যে এলাকায় বসবাস করে শাসন কাজ চালাতেন সেটাই ‘রাজধানী’ বা প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হতো। যে কারণে আগে রাজধানী পরিবর্তনের ঘটনা নিয়মিত ঘটতো।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান বাংলাদেশে গঙ্গাঋদ্ধির প্রধান অংশ ছিল। তাহলে সেটি কোথায়?
আমাদের এখানে সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় কম। কারণ এখানকার প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে মাটি, বাঁশ ইত্যাদির ব্যবহার বেশি ছিল। যার ফলে এগুলো সময়ের সাথে সাথে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে বা পরবর্তী কালে মানববসতি বৃদ্ধির ফলে তারা এগুলো সহজেই ধ্বংস করে দিয়েছেন। এখানে পাথর পাওয়া যায় না বলে গ্রিক, রোমান, ইজিপশিয়ান বা ভারতের কিছু এলাকার মতো পাথরের তৈরি দীর্ঘস্থায়ী দুর্গ বা ইমারত তৈরি করা সম্ভব হয় নি। কিন্তু এখানে সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। তার মানে সে সময়ের দুর্গ এবং স্থাপনা মূলত মাটি, কাঠ, বাঁশ দিয়েই তৈরি হতো।
নরসিংদী জেলার উয়ারী-বটেশ্বরসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে পাওয়া প্রত্ননিদর্শনগুলো রূপকথার কাহিনীর মতো এক প্রাচীন নগরীকে আমাদের চোখের সামনে নিয়ে আসে। পুরো এলাকায় অন্তত পঞ্চাশটি প্রত্নস্থল থেকে পাওয়া নিদর্শন থেকে এটা এখন প্রমাণিত যে, এই সভ্যতা কমপক্ষে আড়াই হাজারের বছরের পুরানো। এখানে প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার, স্থাপত্য, অলংকার, মুদ্রা ও শিল্পকলার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। সেই সময়ের সিল্ক রুটের সাথে এর বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। এখানে পাওয়া নকশা করা পুঁতি, লকেট, মন্তুপূত কবজ, বাটখারা প্রমাণ করে প্রাচীন রোমান সভ্যতার সঙ্গে এর যোগযোগ ছিল নিয়মিত এবং এখানে এই শিল্প ব্যাপকভাবে গড়ে উঠেছিল।
এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রুপার মুদ্রা ও মুদ্রা ভাণ্ডার। পোড়ামাটি ও ধাতব শিল্পবস্তু, মৃৎপাত্র, চিত্রশিল্প, প্রাচীন ধর্মশালা ইত্যাদি প্রমাণ করে এখানে খুবই অগ্রসর কোনো জাতি বসবাস করতো। এবং এখানে পাওয়া মুদ্রাগুলো বিশ্লেষণ করলে এটা দেখা যায় যে, আলেকজান্ডার যখন এই অঞ্চলে এসেছেন তখনো এটি সমৃদ্ধ নগরী ছিল। আর এটি যে সুরক্ষিত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে এর একদিকে নদী ও অন্য দিকগুলোতে পরিখা এবং বিশাল মাটির দেয়াল আবিষ্কৃত হওয়ার পর। এটি একটি দুর্গনগরী ছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রচুর পরিমাণ ধাতব এবং পাথরের অস্ত্রের আবিষ্কার সেই কথা প্রমাণ করে। এই অঞ্চল একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান ছিল। ইতিহাসবিদগণ সব তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে মনে করছেন, চন্দ্রকেতুগড়ের মতোই উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চল প্রাচীন গঙ্গাঋদ্ধির সমৃদ্ধ অংশ ছিল। যেখানে অসীম সাহসী, স্বাধীনচেতা, প্রাচুর্যবান মানুষেরা বসবাস করতেন।
আলেকজান্ডারের সময়ের গঙ্গাঋদ্ধির বর্ণনা করে মেগাস্থিনিস লিখেছিলেন, ‘গঙ্গার শেষ অংশের প্রস্থ আট মাইল এবং যেখানে এটি সব থেকে কম প্রস্থের সেই স্থানে এর গভীরতা প্রায় ১০০ ফিট। সেই মানুষরা যারা সেই সুদূর প্রান্তে থাকেন তারা হলেন গঙ্গারিডাই। এদের রাজার ১০০০ অশ্বারোহী, ৭০০ হাতি এবং ৬০,০০০ পদাতিক সৈন্য নিয়ে সজ্জিত সেনাবাহিনী আছে।’
জানা যায়, এই অঞ্চলের সাহসী যোদ্ধাদের রণকৌশলের পাশাপাশি হাতির কথা শুনে আলেকজান্ডারের বাহিনী আর অগ্রসর হতে ভয় পায়।
প্রাচীনকালে বাংলার পূর্বপুরুষরা শত্রুকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যতো বড় শত্রুই হোক এই স্বাধীনচেতা মানুষের ভূমিতে তাদের কখনো স্থান হয় নি। যুগে যুগে এই কথারই প্রমাণ করেছেন এই অঞ্চলের মানুষ। ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষ সেই ঐতিহ্যকেই আবারো ফিরিয়ে এনেছিলেন। যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

 

ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুর কারণ

ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুর কারণ

দুই মহাদেশের মানুষের জেনেটিক মিল

দুই মহাদেশের মানুষের জেনেটিক মিল

মহামারির সময়ে ইসলাম

মহামারির সময়ে ইসলাম

২৪ ডলার দামের শহর!

২৪ ডলার দামের শহর!

প্রাচীন মুদ্রায় জানা গেল ডাকাতির কাহিনি

প্রাচীন মুদ্রায় জানা গেল ডাকাতির কাহিনি

কায়রোর পথে ২২ রাজা-রানির রাজকীয় প্যারেড

কায়রোর পথে ২২ রাজা-রানির রাজকীয় প্যারেড

Islami Bank Ad