সব
বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮
AD

গভীর অন্ধকারের ঘুম

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২১, ০০:০১
ভূতির সঙ্গে কথা বলে লালুর অলস সময় কাটছে ঠিকই। কিন্তু সত্যি বলতে কি, লালুর মন থেকে কিছুতেই হিল্লিকে সে সরাতে পারে না। যেখানেই যাক, মন পড়ে থাকে ওর কাছে। বাচ্চাদের সঙ্গে লালুর বড় ইচ্ছে করে খেলাধুলা করে সময় কাটাতে, আগের মতো হিল্লির সঙ্গে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করতে। কিন্তু বাচ্চা হওয়ার পর একদম বদলে গেছে সে

তিন বাচ্চার মা হওয়ার পর হিল্লির স্বভাবে বেশ খানিকটা পরিবর্তন দেখা দিল।

চোখে-মুখে সুখের পরশ মাখানো এক ধরনের গদগদ ভাব ভেসে বেড়ালেও আচরণে টান-টান ডোন্ট কেয়ার অভিব্যক্তি। ভুক্তভোগী বেচারা কেবল লালু। পাত্তাই পায় না হিল্লির কাছে, চোখে চোখ পড়লেই ফিরিয়ে নেয়। হিল্লির ভাবখানা এমন যে, মনে হবে, ‘আমি ব্যস্ত আছি, আজাইরা ডিস্টার্ব কইরো না।’ যেন লালু বাবা নয়, স্বামী নয়, অন্য কেউ।

সারাক্ষণ বাচ্চাদের কাছেই পড়ে থাকে হিল্লি । বালুর ওপর ওদের নিয়ে গড়াগড়ি খায় মনের সুখে। বাচ্চা কটি মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার জন্য নিজেদের ভেতর হুড়োহুড়ি করে। কখনো ঝগড়া বাধায়, কখনো খেলায় মাতে, এ এক অপরূপ সৌন্দর্য!

এ সময় লালুর বুক চিরে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। হিল্লি যে বাচ্চাদের পেয়ে ওকে এভাবে ভুলে যাবে ভাবতেই পারেনি। মোট চারজন, জন্ম দেয়ার সময় একজন অক্কা পায়। সেই দুঃখে লালুকে যে কত গালাগাল শুনতে হয়েছে। যেন ওরই দোষে একটি বাচ্চা অকালে ঝরে পড়ল। আর এখন মেতে রয়েছে তিনজনকে নিয়ে। যেন ওর জীবনে সে কেউ নয়।

অগত্যা মনের কষ্ট মনে চেপে লালু এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। ওর বস ভুলু ব্যাপারীও এখন আর অতটা মনোযোগী নয় ওর প্রতি। আগের মতো কাছে ঘেঁষতে চাইলেই বাধাধরা এককথা, ‘করোনার কালে অত ঘেঁষাঘেঁষি করিছ না। কাছে-ধারে পশুপক্ষি না থাহনই ভালা। দূরে থাক হারামজাদা।’ খেঁকিয়ে ওঠে করোনা-ডরে ভীত-সন্ত্রস্ত ভুলু মিঞা।

খুব কষ্ট হয় প্রতিদিন একথা শুনতে। সম্প্রতি ওর এক দূরসম্পর্কের শালা এসেছে দেশবাড়ি থেকে। ওই হারামজাদাই এসব দুষ্টবুদ্ধি জোগান দিচ্ছে দুলাভাইর কানে। লালুর বিরুদ্ধে রীতিমতো শত্রুতা শুরু করেছে এই ধন মিঞা। সুযোগ পেলেই ওর দিকে পাকিয়ে পাকিয়ে তাকায়। যেন ওর সৌভাগ্যে পা মাড়াচ্ছে লালু!

এ দুঃসময়ে ভূতিই ওর একমাত্র ভরসা। সিপাহীবাগ থেকে সে হেঁটে আসে ওর কাছে। হিল্লির চেনা-জানার সূত্রে প্রাথমিক পরিচয়; আগে যার সঙ্গে থাকত সে কী একটা ভাইরাসের সংক্রমণে মারা গেছে গত বছর। এখন একেবারেই একা। বকবকানির বাই; লালু চুপচাপ সব কথা শোনে আর মাথা নাড়ে। বহুদিন পর মনের মতো একজন শ্রোতা পেয়ে ভূতিও মহা খুশি। মনে যা আসছে তাই গড়গড় করে বলে চলেছে। কিছু বানিয়ে, কিছু সত্যি কথা।

ভূতির সঙ্গে কথা বলে লালুর অলস সময় কাটছে ঠিকই। কিন্তু সত্যি বলতে কি, লালুর মন থেকে কিছুতেই হিল্লিকে সে সরাতে পারে না। যেখানেই যাক, মন পড়ে থাকে ওর কাছে। বাচ্চাদের সঙ্গে লালুর বড় ইচ্ছে করে খেলাধুলা করে সময় কাটাতে, আগের মতো হিল্লির সঙ্গে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করতে। কিন্তু বাচ্চা হওয়ার পর একদম বদলে গেছে সে। হিল্লি আর আগের হিল্লি নেই। বেমালুম বদলে যাওয়া এক অস্তিত্ব।

আজ ভূতি আসেনি। সে একা-একা দাঁড়িয়ে রয়েছে রাস্তার মোড়ে। শুক্রবার হওয়ায় রাস্তাঘাটে তেমন ভিড় নেই। সবকিছু সাফসুতরো। দু-চারটা শালিক কিংবা পাতিকাক সুস্থির হয়ে পাশের আঁস্তাকুড়ে ঠোকাঠুকি করে চলেছে খাবারের খোঁজে।

সহসা এ সময় কোট-টাই পরা একটা লোক গলির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এই সাত সকালে। সারা রাত ঘুমানোর পরও চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। চোখের সাদায় ছুঁয়ে রয়েছে হতাশা।

লোকটা কী ভেবে লালুর কাছে এসে দাঁড়াল। মোবাইলে দু-তিনটি ফোন করল এখানে-সেখানে। কণ্ঠটা বসা, নষ্ট রেডিওর মতো চিঁ চিঁ করে কেবল চাপা শব্দ বেরুচ্ছে সেখান থেকে। মোটেই মানুষের গলা বলে মনে হয় না লালুর কাছে।

লোকটার নাম ইকবাল। বারবার করে মোবাইলে দমকা বাতাসের ঝাপটার মতো গলায় ‘আমি ইকবাল, আমি ইকবাল’ বলে চেঁচাচ্ছিল। লালু বুঝতে পারল প্রচণ্ড পেরেশানিতে রয়েছে মানুষটা।

একটু বাদে লালুকে অবাক করে দিয়ে দামি প্যান্ট-শার্ট পরা মানুষটা ওর সামনে এসে ধপাস করে মাটির ওপর বসে পড়ল। গলার নিচে আদর দিয়ে বলল, ‘খুব দুঃখ মনে, না?’

লালুর লেজ নাড়ানো শুরু হলো। মানুষের আদুরে আঙুলের এতটুকু স্পর্শ পেলেই মন আনচান করতে শুরু করে দেয়, আপনা-আপনি। এত অপমান, এত অবজ্ঞা, এত নিষ্ঠুরতা- তবু একবার আঙুল ছোঁয়ালেই ভগবানের অস্তিত্বের মতো সব ফকফকা ও পবিত্র লাগে। মনে হয় আর কোনো দুঃখ নেই। এখন থেকে ওর জীবনে নেমে আসবে চির বসন্ত।

‘ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখিস।’ বলে ইকবাল পকেট থেকে রুমাল বের করে নিজের চোখ দুটো মুছে নেয়। লালুর মনে হলো লোকটা ওকে নয়, নিজের কথাটাই বলে চলেছে।

সহসা পাগলের মতো বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় ইকবাল। বাঁ-হাত দিয়ে থাবড়ে প্যান্টটা ঝেড়ে নেয়। তারপর একটুও অপেক্ষা না করে দ্রুতপায়ে সামনে এগিয়ে একটা রিকশায় চড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

এ সময় ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে গলি থেকে বের হয়ে এল ভূতি। চোখ বেয়ে জল গড়াচ্ছে। কাছে এসে বলে উঠল, ‘মানুষ অত হারামি?’

‘কেরে? কিতা অইছে?’ জানতে চায় লালু। দৃষ্টি ওর ভূতির পায়ের ওপর।

‘একটা সামান্য ভিখারি, ভাবলাম লোকটা বালা, কাছে গিয়া আপনজনের লাহান চক্কর কাটলাম কডা, ওমনি হাতের থালাডা দিয়া ঠ্যাং-এ বাড়ি মারল কডা। ও মাগো।’ ককিয়ে ওঠে সে।

‘লোক বুইজা চক্কর কাটবি না?’

‘অসুবিধা কিতা? আমি কি কামড়াইতে গেছি?’

‘ওই বেডা মনে করছে তুই কামড়াইতেই কাছে ঘেঁষছস? এ্যাইডা বুজছ না?’

‘আর জিন্দিগিতেও মাইনষের কাছে ঘেঁষুম না। ভাবছে কি হেরা?’

‘বালডা ছিঁড়া যাইবো হেগো। হেগোর তলানিটুক খাইয়া ভাব দিয়া কাম আছে? বাসাত গিয়া আরাম কর। তাইলেই সাইরা যাইবো।’

‘তুমার মতন আমি কি অত বড়লোক গো ভাই? আমার বাড়ি কই? রাস্তাত থাহি, রাস্তাত হুই। আমরা রাস্তার জঞ্জাল। বুজলা গো লালু ভাই।’

একথার কোন উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না সে। ভূতি-ফুতিরা সুযোগ পেলেই নাকি কান্না শুরু করে দেয়। এসব কান্নাকাটির কোন সীমা-পরিসীমা নেই। শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। যত শুনবে তত ভেতরে এক ধরনের অসার-অথর্ব বোধ ছড়িয়ে পড়ে। তখন আর কিছুই ভালো লাগে না। মন ভালো করতে এসে উল্টো বিষণ্ন হয়ে ঘরে ফিরতে হয়।

সে আর দাঁড়ায় না। ফিরে আসে নিজের ডেরায়। বাচ্চা তিনটে ওকে দেখে লাফিয়ে পড়ে কোলে। দূর থেকে হিল্লি হেসে ওঠে। মুখে বলে, ‘বাপ হওন অত সহজ না । ঠ্যালা সামলাও এইবার।’

ওদের সংস্পর্শে আসতেই লালুর সারা শরীরে শিহরণ খেলে যায়। বাচ্চা তিনটি যত ওর শরীরে লাফিয়ে-লাফিয়ে পড়ছে তত অজানা আবেশে চোখ বুজে আসছে। বাবা হবার যে এত আনন্দ তা আগে বোঝা যায়নি। সে তারিয়ে তারিয়ে সেই অমিয় সুখ উপভোগ করতে থাকে মিঠে-কড়া রোদের তাপে।

কদিন বাদে ফের ইকবালের সঙ্গে দেখা লালুর। থানার সামনে কোট-টাই পরা বেহুদা মানুষটা একটা আইসক্রিম চুষছে। চশমার ভেতর হাঁ করা দুটো চোখ তাক করে রয়েছে থানার দিকে। লালুর মনে হলো কোট-টাই পরা ভুলু ব্যাপারী! সে মনে মনে না হেসে পারে না।

ইকবালকে ঘিরে দুই চক্কর কাটতেই ওর চোখ গিয়ে পড়ল লালুর ওপর। সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল। রাস্তার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে মুখের কাছে মুখ এনে বলে উঠল, ‘ক্যামন আছো মিঞা?’

লালু মৃদু স্বরে ঘেউ দিয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে ইকবাল উত্তর দেয়, ‘আমার চাইতে তোরাই ভালা আছিস রে। আমি তো আধা-পাগল একটা মানুষ, রাস্তাত দাঁড়াইয়া আইসক্রিম চুষি, তোগো লগে বিড়বিড় করি, পুরা পাগল যে কবে হমু, কেডা জানে?’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস চাপে। পরক্ষণে দম নিয়ে মন্তব্য করে, ‘আসলে পাগলরাই তোগো বুঝবার পারে। ভালা থাকলে আমরা সন্দেহে ভুগি। কেউরে বিশ্বাস করবার পারি না।’ বলে আইসক্রিমটা গলায়-জিহ্বায় ঘষতে শুরু করে।

লালুর কেন যেন মনে হলো কোট-টাই পরা এ লোকটার মূল্যবান কিছু একটা হারিয়ে গেছে। এখন উদ্ভ্রান্তের মতো সেটি খুঁজে ফিরছে হেথায়-হোথায়।

ইকবাল পাশের চায়ের দোকান থেকে একটা পাউরুটি কিনে এনে ওকে খেতে দেয়। এক-একটি টুকরো ওর মুখে তুলে দিচ্ছে আর আপনমনে বিড়বিড় করে নানা কথা বলছে। বাজারের এত ভিড়ের ভেতরও সে কীভাবে এত কথা চালিয়ে যাচ্ছে লালুর সঙ্গে, তাই বিস্ময়ের ব্যাপার।

‘তোরে একটা কথা কই। কুনদিন চাকরি করবি না। সামান্য ব্যবসা অইলেও সই। কিন্তু চাকরির নাম নিলেই পাছা মারবি। সোজা হিসাব। বুঝলি?’ রাগের চোটে একসঙ্গে সব কথা বলতে গিয়ে মুখগহ্বর থেকে থুতু ঝরে।

থুতুর ঝড়ো বাতাসে টিকতে না পেরে লালু মুখ ফিরিয়ে নেয়; হাঁ করা মুখে ওর অজ্ঞানতা। বুঝতে পারছে না চোখের সামনের মানুষটা আসলে কী বলতে চাইছে। বোকা-বোকা চোখে তাকিয়ে ওকে কেবল দেখছে আর রুটি চিবোচ্ছে।

‘বুজলি, চাকরির খ্যাতা পুড়ি আমি। আর বস? মাঝে মাঝে মনে অয় বসের পাছায় যদি একটা কইষা লাত্থি দিতে পারতাম। হালার পো একটা মুখ্যু। অথচ ট্যাকার গরমে যা খুশি তা-ই করবার চায়। মাস শ্যাষে কটা ট্যাকা পাই বইলা হালার পো যা খুশি তাই করে! জানিস কী করে? তোরে কেউ কিছু করলে তো ঘেউ কইরা তেড়ে আইবি। আমি তাও পারি না। খালি সহ্য করি। এমবিএ পাস কইরা এর চেয়ে ভিক্ষা করলেও ভালা আছিল।’ বলতে বলতে সে হাঁপিয়ে ওঠে। উঠে দাঁড়িয়ে শরীরে মোচড় দেয়। হাতের আঙুল বেয়ে গড়ানো আইসক্রিমের লাল বিন্দুগুলো শুকিয়ে নেলপলিশের মতো খটখটে দেখায়।

ইকবাল ঘড়ি দেখে। বুকটা ধড়াস-ধড়াস করে ভয়ে। কারখানাটা ছিল ওদের কোম্পানির নিজস্ব জায়গায় গড়ে তোলা। সবই ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ রেইড। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে কিছুতেই আর বোঝানো গেল না যে কনডেন্সড দুধ এভাবেই তৈরি হয়। আমদানি করা নষ্ট গুঁড়া দুধের সঙ্গে স্যাকারিন আর ভেজাল ফ্যাটের মিশেল দিয়ে তৈরি এই সুস্বাদু ঘন দুধ। বাচ্চারা মহাসুখে পাউরুটির গায়ে এটি মিশিয়ে খায়। এক চামচ দুধ বেশি দেয়ার জন্য রীতিমতো ঝগড়া বাধে চা-ওয়ালার সঙ্গে। অথচ এ দুধে রয়েছে যত নষ্ট উপাদান, কেউ জানে না।

পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক চ্যানেল সবখানে ভাসছে এই তাজা খবরটি। সাধারণ মানুষের ভুরুজোড়ায় গিঁট, চোখে অতল বিস্ময়। ইকবালের মুখ দেখানো দায়, সমস্ত দোষ এসে পড়েছে ওর ওপর। কারণ সে-ই ছিল কাশিয়ানী গ্রুপ অব কোম্পানিজের অন্তর্ভুক্ত দুগ্ধজাত সামগ্রী বেচাকেনার প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

সেই দুঃখ ও ভয়ের কথাটাই সে বিড়বিড় করে লালুকে বলতে চাইছে। ফিসফিস করে বলছে, ‘ক, আমার কি কুন দোষ আছে, ক? মালিক শালা একটা বদ, বাটপার। লেখাপড়া নাই। গায়ের জোরে মাইনষের বাড়িঘর দখল কইরা বড়লোক অইছে। সেই ট্যাকায় নানা কলকারখানা বানাইছে। আর অহন আমার গালে কতায় কতায় চড় মারে। সব দোষ অহন আমার। আসামি অহন আমি। যে-কুন সময় আমারে এরেস্ট করব পুলিশ। রাইতে ঘুম নাই। চোখের পাতা এক করবার পারি না। অথচ মালিক হালার কুন দোষ নাই। শালা গুণ্ডা কুনহানের।’ রাগে-ক্ষোভে চোখ দুটো বড় দেখায় ওর। মাথার টাকে বিন্দু বিন্দু চৈতালি ঘাম বেয়ে মুখের ওপর পড়ছে। সেদিকে ওর খেয়াল নেই। সে কেবল কথাই বলে চলেছে চাপা, ভাঙা, ক্ষ্যাপা গলায়।

লালু সামনের দুপা বিছিয়ে শুয়ে পড়ে। ওর ভাবে মনে হচ্ছে সে খুব বুঝনাদার। ইকবালের কাছ থেকে রুটি পাওয়ায় সে খুব তুষ্ট। তাই বেচারা ইকবালের কষ্টে সেও খানিকটা দগদাচ্ছে। বাঁকা চোখে সে বারবার ওর দিকে কেবল তাকাচ্ছে আর মাথা নিচু করে কিছু একটা ভাবছে।

‘আমার কষ্ট কেউ বুঝে নারে। বউ একমাত্র পুলারে লইয়া বাপের বাড়িত পালাইছে। যাওনের সময় কইছে, আমি খারাপ লোক, খাদ্যে ভেজাল দিই আর কুনদিন ফিরবে না। আর মালিক যখন-তখন আমারে চড়াইতে চায়। তার ধারণা, আমার লাহান অপদার্থ-অকালকুষ্মাণ্ড দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়ডা নাই। অহন জেলে গিয়া পইচা মরণ ছাড়া আর কুনো উপায় নাইরে ভাই। জীবনে কুনদিন থানার কাছ দিয়াও হাঁটি নাই। আর অহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা থানার সামনে দাঁড়াইয়া থাহি কষ্টে বুক চাইপা।’ বলে সে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলে।

এ সময় ইকবালের চেহারাটা একেবারেই অন্য রকম লাগে লালুর কাছে। মানুষের দম্ভ, অহংকার, নিষ্ঠুরতা সব মাঝে মাঝে একেবারে জলে মেশানো পাউরুটির টুকরো হয়ে পড়ে। মানুষ অত শক্তিশালী অথচ কখনো সেই মানুষই অসহায় আর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে মানুষেরই কাছে। কাল্পনিক কামড়ের ভয়ে যতই পশুদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনে মেতে উঠুক, আসলে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু মানুষ; দয়া-মায়াহীন নিষ্ঠুর-স্বার্থপর মানুষ সবার আগে মানুষকেই ঘায়েল করে আনন্দ পায়।

লালু গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর ইকবালের মুখের সামনে ঘাড় নেড়ে বালি ঝেড়ে নিল। সমস্ত বালি ওর মুখেচোখে পড়ায় সে ওয়াক থু করে দ্রুত রুমাল বের করে মুখ মুছে নেয়। পরক্ষণে ক্রুদ্ধ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘হালার পো কুত্তার বাইচ্চা। কুত্তা তো কুত্তাই, ভালা অইবি কেমনে?’ বলে লাথি মারার জন্য তেড়ে আসে লালুর দিকে।

সে একবার পেছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে এতটুকু পাত্তা না দিয়ে কেবল মুচকি হাসল। ঘেউ করে একটা শব্দ তুলে বলল, ‘তোগো জানা আছে। স্বার্থে লাগলেই সব শেষ।’

লালু হাঁটতে হাঁটতে তালতলা বাজারের পিছনে এসে দাঁড়ায়। এখান থেকে কয়েক কদম ভুলু ব্যাপারীর মুরগির খোঁয়াড়। বাচ্চাদের জন্য মনটা পুড়ছে। এখুনি চলে যাবে কিনা ভাবছে। মাথার ওপর কড়া সূর্য। বাতাসে পথভোলা ধুলার ঢেউ। মানুষ একেই ফাগুন ভেবে আহ্লাদ দেখায়। গাছে গাছে পাতা-ফুল গজায় দেখে আহা-মরিমরি বলে প্রবল আবেগে ভাসে। কদিন পরই ঝেপে নামবে বৃষ্টি, সব ভাসবে জলে। বড়ই কষ্ট তখন ওদের। জলে গড়াগড়ি খেতে হয় সারাক্ষণ।

একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে যখন এরকম ভাবছে লালু, ঠিক তখনই গলির ভেতর থেকে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এল ভূতি। পিছনে তাড়া করে ফিরছে উঠতি বয়সের কজন ছেলেছোকরা। ওদের একজনের হাতে জ্বলন্ত মশাল। ওদের চোখগুলো নিষ্ঠুর, খুনির মতো। কড়া বয়সের এরকম চেহারার সঙ্গে মোটেই তা যায় না।

সহসা লালু চমকে উঠল। দূর থেকে মনে হলো ভূতির গা থেকে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। সকালে আবেগ দেখাতে গিয়ে ভুল বুঝে এক ভিক্ষুক থালা দিয়ে আঘাত করে ওর বাঁ-ঠ্যাংটা ভেঙে দিয়ে গেছে। এখন সেই পা নিয়ে প্রাণভয়ে দৌড়ে এসে পড়ল পাশের ময়লা-আবর্জনার উঁচু ঢিবিটার ওপর। তীব্র যন্ত্রণায় অবিরাম সেখানে গড়াগড়ি খাচ্ছে আর উচ্চকণ্ঠের ঘেউ শব্দে আর্তনাদ করে চলেছে।

ছেলেগুলো ভূতির শরীরে আগুন ধরিয়ে মজাদার বায়োস্কোপ দেখছে। সেই অসহ্য জ্বালায় গলাকাটা পশুর মতো ক্রমাগত আবর্জনার ওপর তড়পাচ্ছে সে। হয়তো আর বাঁচবে না! ভূতির তীক্ষ্ন গগনবিদারী চিৎকার শুনে অনেকেই ছুটে এসেছে এখানে। অথচ এতগুলো মানুষের ভেতর কেউই ওর করুণ আর্তিটুকু অনুভব করতে পারছে না ।

লোকগুলো প্রথমেই পাড়ার উঠতি মাস্তান সুলেমানকে জিজ্ঞাসা করছে, ‘কি অইছে রে সুলেমান?’

কিশোর-গ্যাং-এর লিডার সুলেমান তাচ্ছিল্যভরে উত্তর দেয়, ‘কুত্তার বাইচ্চা আমাগো পিকনিকের মুরগি খাইয়া ফালাইছে। শালা বানচোত।’ বলে বেপরোয়া সুলেমান অসহায় মৃতপ্রায় কুকুরটার দিকে নিষ্ঠুর চোখে তাকিয়ে থাকে। আসামিকে শাস্তি নিশ্চিত করায় মনের ভেতর অজস্র আনন্দের ঝলক, ছটফটিয়ে অস্থির করে তুলছে ওকে।

‘এই গরমকালে পিকনিক?’ এক ফোকলা দাঁতওলা বুড়ো এ মন্তব্য করে।

‘আমগো পিকনিক তো হারাবছরই। পছন্দ আইলে হের বাড়ি তার বাড়ির মুরগি ধরি আর পিকনিক খাই। হিহিহি।’ বলে নিজের কৃতকর্মে নিজেই আত্মহারা হয়ে হেসে ওঠে । ওর বাবা মাছ বেচে তালতলা বাজারে। লালু ভালোই চেনে তাকে। সে হতবাক ছেলেটার এমনতর নিষ্ঠুর আচরণে, কদিন আগেও তালতলা বাজারের পিছনে কাচের গুলি খেলেছে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে, এখন ডাকাতের সর্দার!

এ সময় হিল্লিকে দেখতে পায় লালু। চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে সে তার তিন বাচ্চা নিয়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে সে ওদের পথ আগলে দাঁড়ায়, ‘তোমরা এদিকে কেন?’

‘কি হইছে? অত চিৎকার কেন? আমাদের কেউ কি বিপদে পড়ছে?’

‘ভূতির গায়ে আগুন দিছে পোলাপান। হয়তো বাঁচত না। তুমার এই করুণ দৃশ্য দেহন লাগদ না। তুমি ডেরায় যাও।’ বলে হিল্লির চলার রাস্তা বরাবর দাঁড়িয়ে পড়ে সে।

ওর চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে কষ্টে। ভূতি ওর দূরসম্পর্কের আত্মীয় হয়। আগে মাঝে মাঝে এখানে-সেখানে দেখা হতো। রূপের জেল্লা ছিল এককালে। ক্ষুধায় ভুগতে ভুগতে এখন হাড্ডিসার। সেই ভূতির গায়ে আগুন?

‘তুমি ওগোরে দেইখা রাখ। আমি একটু চোখের দেখা দেখি।’ বলে হিল্লি ছুটে যায় সেদিকে।

ভূতির একটানা ঘেউ-ঘেউ শব্দে চারপাশের আকাশ-বাতাস তখন ভারী। কাতর গলায় ভূতি যত ‘আমায় বাঁচাও, আমায় বাঁচাও, আমি শরীরের যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি’ বলে চেঁচাচ্ছে তত দাঁড়ানো ছেলেগুলো হেসে কুটি কুটি হচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে হিল্লির চোখে জল এসে গেল। এরই ভেতর সুলেমান গ্রুপের এক উৎসাহী কিশোর হাতে একটা মুখকাটা প্লাস্টিকের খালি বোতল নিয়ে ছুটে যায় ভূতির দিকে। ভূতির মুখে সেটি জোর করে পরিয়ে সুলেমানের কাছে ফিরে এসে খিকখিক করে হাসতে থাকে। মুখে বলে, ‘চুদানির পুত আর ঘেউ ঘেউ করবার পারব না। খ্যালা শেষ।’

দৃশ্যটা এতোই পৈশাচিক যে বেশিক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। হিল্লির বুকটা ফেটে যাচ্ছে কষ্টে। তীব্র বমির ভাব হচ্ছে, পেট মোচড়ানোর পাশাপাশি মাথাটাও ঘুরছে ঘন ঘন। কানে অবিরাম ছুরি চালাচ্ছে ভূতিকে ঘিরে থাকা সুলেমান গ্রুপের বীভৎস সব হাসির শব্দ।

এদিকে যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ভূতি একটু একটু করে নেতিয়ে পড়ছে মৃত্যুর কোলে। অগ্নিদগ্ধ মাংসের দুর্গন্ধটা ধীরে ধীরে পুরো তালতলা বজারটাকেই গ্রাস করে নেয়। হিল্লির নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে সেই গন্ধে।

লালুর চোখেও মৃত্যুর মতো ঘন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। দুর্বল হয়ে আসে ওর সমস্ত শরীর। মুখ দিয়ে ঘেউ শব্দটা পর্যন্ত এখন আর বের হচ্ছে না। তবু অনেক কষ্টে বাচ্চাদের তাগাদা দিয়ে বলে ওঠে, ‘চল, চল। এইখানে থাকতে অইবো না। এইখানে থাকলে আমরা কেউ বাঁচুম না। ডেরায় চল।’

লেখক পরিচিতি: মণীশ রায় আশির দশকের অন্যতম গল্পকার। তার জন্মদিন ১৯৬৪ সালের ১৪ এপ্রিল। জন্মশহর তিতাস-বিধৌত ব্রাহ্মণবাড়িয়া। লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে চাকরি করছেন একটি বেসরকারি বিমা কোম্পানিতে।

প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়’, মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরে বের হয় নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়। প্রকাশিত গ্রন্থের ভেতর ‘একলা আকাশ’, ‘শোভনা’, ‘র‌্যাডক্লিফের লাটিম’, ‘পরি ও অন্যান্য গল্প’, ‘জোড়াতালির গপ্পো’, ‘আচানক’, ‘হাত বাড়ালেই লাল-সবুজ’, ‘মুক্তিযদ্ধের গল্প’ অন্যতম।

শিল্প ও সাহিত্য বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]
AD

সাম্প্রতিক

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্য ১৭ এপ্রিল

প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্য ১৭ এপ্রিল

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

রিজভীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি

রিজভীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি

চলে গেলেন মিতা হক

চলে গেলেন মিতা হক

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

পৌনঃপুনিক

পৌনঃপুনিক

অন্ধকার

অন্ধকার

প্রবীণ ভার্সেস নবীন

প্রবীণ ভার্সেস নবীন

এক পেয়ালা চা

এক পেয়ালা চা