সব
রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ২৮ চৈত্র ১৪২৭

মেজর জিয়া ও মুক্তিযোদ্ধাদের মান-সম্মান

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৮:০০
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৯ দিন পর তৎকালীন সেনাপ্রধান সফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল। এ থেকে ধারণা করা যায় যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, সেনাপ্রধানকে সরানো এবং মোশতাকের সরকার গঠন প্রক্রিয়ার নেপথ্যের শক্তির জোগানদাতা ছিলেন জিয়াউর রহমান

১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় প্রিয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদের সভায় বীরসূচক খেতাব প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। দেশের সামরিক ক্ষেত্রে অবদান রাখার ওপর ভিত্তি করে প্রচলন করা হয় খেতাব প্রদানের ব্যবস্থা। বীরদের অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে এই খেতাব ভাগ করা হয় চারটি ক্যাটাগরিতে। সম্প্রতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)। এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। এ পরিপ্রেক্ষিতে সবারই জানা প্রয়োজন মেজর জিয়ার অতীত কর্মকাণ্ড।   

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে মেজর হিসেবে কর্মরত ছিলেন জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার জন্য তখন দেশব্যাপী যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছিল, সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে তিনি তেমন অবগত ছিলেন না। কারণ, তিনি তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রাথমিক স্তরের একজন কর্মকর্তা। এই পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ব্যারাকেই থাকেন। তাই স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল বিক্ষোভময়তা সম্পর্কে তার অবগত থাকার কথা নয়। ১৯৭১ সালে পাক হায়েনাদের হাতে বন্দী হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বন্দী হওয়ার আগে তৎকালীন ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেই সময়ে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতারা একজন বাঙালি আর্মি অফিসার খুঁজছিলেন, যাকে দিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুর সপক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করাতে পারেন। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতারা তৎকালীন পাকিস্তানি আর্মির বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে নিয়ে যান। আওয়ামী লীগ নেতারা জিয়াকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সপক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পুনরায় পাঠ করান। এর পরের ইতিহাস সবারই জানা।  

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেয়ার জন্য জারি করা হয় একটি অধ্যাদেশ, যা কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নামে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত করার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন। এটি ১৯৭৫ সালের ৫০ নম্বর অধ্যাদেশ হিসেবে পরিচিত। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৯ দিন পর তৎকালীন সেনাপ্রধান সফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল। এ থেকে ধারণা করা যায় যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, সেনাপ্রধানকে সরানো এবং মোশতাকের সরকার গঠন প্রক্রিয়ার নেপথ্যের শক্তির জোগানদাতা ছিলেন জিয়াউর রহমান। ১৫ আগস্ট থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন মোশতাক। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মাদ সায়েম। বেশির ভাগ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই দুই পুতুল রাষ্ট্রপতির নেপথ্য চালক হিসেবে মূল দায়িত্ব পালন করেছিলেন জিয়াউর রহমান।

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। তিনিই স্বাধীন দেশের প্রথম সামরিক বাহিনীর ও সরকারি কর্মকর্তা, যিনি নির্বাচনহীন রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেছিলেন। সব ঘটনাপ্রবাহের যৌক্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭৫ এবং তার পরবর্তী সব ঘটনার নেপথ্যের শক্তির ক্রীড়নক ছিলেন জিয়া। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সামরিক বাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) নামের রাজনৈতিক সংগঠনটি গঠন করেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে বিএনপি নামে রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। আর এর মাধ্যমে মেজর জিয়া দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নজির স্থাপন করেন। কারণ, এর পূর্বে এই দেশে কোনো সরকারি চাকরিজীবী চাকরিরত অবস্থায় এভাবে রাজনৈতিক দল গঠন করেনি। পরবর্তী সময়ে জিয়ার পথ অনুসরণ করে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল এরশাদ। তিনিও ক্ষমতায় এসে জিয়ার অনুসৃত পথ ধরে রাজনৈতিক দল তৈরি করেন।

১৯৭৭ সালে জিয়া তার সরকারের কর্মকাণ্ডগুলোর পক্ষে জনগণের সমর্থন আছে কি না, তা যাচাইয়ের নামে একটি গণভোট আয়োজন করেছিলেন। যা ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোট হিসেবে পরিচিত। জিয়া ক্ষমতায় থেকে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এবং যথারীতি প্রহসনের ভোটে জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। তারপর ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জিয়ার শাসনামলে দেশে দ্বিতীয়বার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে পায় ২০৭টি আসন, আওয়ামী লীগ পায় ৫৪টি। আর জিয়ার আশীর্বাদে পুনঃজন্ম লাভ করা মুসলিম লীগ পায় ৫টি, বাদবাকি আসনগুলো লাভ করে অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এই সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আনা হয় ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল। এই সংশোধনীটি বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্যতম সংশোধনী হিসেবে অভিহিত। কারণ এই সংশোধনীর মাধ্যমে যে বিষয়গুলো সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়েছে, তা মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং চেতনার পরিপন্থী। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীরা এই সংশোধনীটির মধ্য দিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। সাম্প্রদায়িকতা, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, মোশতাক কর্তৃক জারি করা কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বৈধ হয়ে যায় এ সংশোধনীর মাধ্যমে।

তা ছাড়া, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্র কর্তৃক সংঘটিত সকল হত্যাকাণ্ড (জেলহত্যা, কর্নেল তাহেরসহ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা) ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ড যারা ঘটিয়েছিল, তাদের সবাইকে এই সংশোধনীর মাধ্যমে মুক্ত করে দেয়া হয়। পঞ্চম সংশোধনীটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছিল স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার শাহ আজিজুর রহমান।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর মেজর জিয়ার শাসনামলে যে পরিবর্তনগুলো তিনি করে গেছেন, তা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। যেমন-

১.       ১৯৭৩ সালের দালাল আইন বাতিল করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের মুক্ত করে দেয়া।

২.       পাক হায়েনার দোসর হিসেবে পরিচিত এ-দেশীয় রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করেছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান।

৩.      পাক সেনাদের দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করার কাজে যারা সহযোগিতা করেছিল, তাদের তিনি মুক্ত করে দেন। 

৪.       দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আলবদর, আলশামস বাহিনীর সদস্য যারা পালিয়ে বিদেশ চলে গিয়েছিল, তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত করেন।

৫.       সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ সংযোজন করেছিলেন।

৬.       জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে মৌলবাদী গোষ্ঠী এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক সংগঠনসমূহকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন।  

৭.       বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন এবং বিদেশস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহে তাদের চাকরি দিয়েছিলেন।

৮.      সেনাবাহিনীতে কর্মরত মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত সেনা কর্মকর্তাদের প্রমোশন দিয়ে সেনাবাহিনীর উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করেন।

৯.       বিভিন্ন বিদ্রোহী আখ্যা দিয়ে সেনাবাহিনীতে কর্মরত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রহসনমূলক বিচারের নামে দোষী সাব্যস্ত করে হত্যা করেন।

১০.     তিনি কুখ্যাত রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন, তা ছাড়া, বহু রাজাকারকে তিনি সরকারি কর্মকাণ্ডে জড়িত করেন তার শাসনামলে।

এ রকম বহু উদাহরণ দেয়া যাবে জিয়ার শাসনামলে, যেগুলোর মাধ্যমে এ-দেশীয় পাকিস্তানি দোসররা পুনর্জীবন ফিরে পেয়েছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে। জিয়া কর্তৃক সম্পাদিত কার্যক্রমগুলো ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং আদর্শের পরিপন্থী। তার কল্যাণেই এ দেশে পাকিস্তানি আদর্শিকরা রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে, তা-ও অস্বীকার করার উপায় নেই।

লেখক: কলামিস্ট

সারাক্ষণ মতামতের বৈচিত্র্যে বিশ্বাস করে। এই লেখার বিষয়ে কারো যদি কোন ভিন্নমত থাকে তাহলে অনূর্ধ্ব ৪০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান আমাদের কাছে। সারাক্ষণ আপনার ভিন্নমত সাদরে গ্রহণ করবে। আপনার ভিন্নমত প্রকাশ হবে পাঠকের অভিমত কলামে। সঙ্গে আপনার নাম, সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাবেন, যা আপনার লেখার সঙ্গে প্রকাশ হবে। ভিন্নমত পাঠানোর ই-মেইল : ‍[email protected]
মতামত বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]

জনপ্রিয়

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

চলে গেলেন মিতা হক

চলে গেলেন মিতা হক

বাতিলই হলো পাকিস্তানের বাংলাদেশ সফর

বাতিলই হলো পাকিস্তানের বাংলাদেশ সফর

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

অপু উকিল করোনায় আক্রান্ত

অপু উকিল করোনায় আক্রান্ত

উত্তরায় ট্রেনের ধাক্কায় অটোচালকের মৃত্যু

উত্তরায় ট্রেনের ধাক্কায় অটোচালকের মৃত্যু

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

জেএমবির শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার

জেএমবির শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ
ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ

মামুনুল হক: ধর্মব্যবসায়ীর কুৎসিত চেহারা
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

মামুনুল হক: ধর্মব্যবসায়ীর কুৎসিত চেহারা

টাইম ম্যানেজমেন্ট, নাকি টাইম প্রায়োরাটাইজেশন?
জিয়া হাসান

টাইম ম্যানেজমেন্ট, নাকি টাইম প্রায়োরাটাইজেশন?