সব
রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ২৮ চৈত্র ১৪২৭

পাপুলকাণ্ড: অশুভ সংস্কৃতি

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০:০০

লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সাংসদ কাজী শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুলকে কুয়েতে অর্থ ও মানব পাচারের মামলায় চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে কুয়েতের আদালত। এই প্রথম বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য বিদেশে ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হলেন। কত বৃহৎ এক লজ্জার মুখোমুখি হলাম আমরা। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এমন একজন মানুষ আমাদের দেশে আইনপ্রণেতা হতে পেরেছিলেন কোন পরিবেশ টিকে থাকার কারণে? সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে পাপুল সাংসদ হয়েছিলেন টাকার জোরে। প্রকৃত রাজনীতির সঙ্গে যার সম্পৃক্ততা ছিল না, বরং অসৎ কাজের সঙ্গে যিনি যুক্ত ছিলেন- এমন একজন ব্যক্তি টাকা খরচ করার কারণে সংসদ সদস্য হতে পেরেছিলেন- এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে বর্তমানে আমাদের দেশে রাজনীতির মান কতটা নিম্নগামী। ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদ এবং তাদের স্তাবকরা রাজনৈতিক পরিবেশের অধঃপতনের কথা অনুধাবন করলেও তা স্বীকার করেন না। কিন্তু রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিবেশের যে অধোগমন ঘটেছে, অনিয়ম আর অন্যায় প্রশ্রয় দেয়ার চর্চা যে বিদ্যমান নানা ঘটনায়, তা ঠিকই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সচেতন নাগরিকদের কাছে।

পাপুলের সংসদ সদস্য পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু দেশের যা অবমাননা হওয়ার তা তো হয়েই গেল। ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত একজন মানুষ বাংলাদেশে জনপ্রতিনিধি ছিলেন, তা তো দেখল অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকরা। জানা গেছে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে ২০১৮ সালে সাংসদ হয়েছিলেন পাপুল। নির্বাচনের সময় লক্ষ্মীপুরে অনেকটা প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছিল যে ১২ কোটি টাকার বিনিময়ে মহাজোটের প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত রাখেন তিনি। নির্বাচনের আগেই নাকি পাপুল নিজের বিজয় অনেকটা নিশ্চিত করে ফেলেছিলেন। পরে তিনি তার স্ত্রীকেও সংরক্ষিত আসনে সাংসদ করেন। তাদের এলাকায় প্রচার আছে যে সাংসদ হওয়ার জন্য এই দুজন তখন খরচ করেছিলেন অর্ধশত কোটির বেশি টাকা।

রাজনীতি করার যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নয় বরং অঢেল টাকা খরচ করে যখন কেউ একটি সমাজে আইনপ্রণেতা হয়ে যেতে পারেন, তখন সেই সমাজে সত্যিকারের রাজনীতি টিকে আছে- এমন দাবি কি করা সম্ভব? এমন অন্যায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার অর্থ হবে রাজনৈতিক অঙ্গন এবং অনেক মানুষের মন বর্তমান সমাজে কালিমাগ্রস্ত হয়েছে- এই বাস্তবতা স্বীকার না করা। কার্ল মার্কস একটি সুন্দর কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, লজ্জা একটি বৈপ্লবিক অনুভূতি। মার্কসের এই কথাটি নির্দেশ করে নিজের নীতিহীন কাজের জন্য লজ্জিত হলেই মানুষ অন্যায় এবং অনৈতিক কাজ করা থেকে বিরত থাকবে। লজ্জাবোধের কারণেই ব্যক্তির মানসিকতায় আসে রূপান্তর আর শুভ পরিবর্তন। কোনো সমাজে বিপ্লব যেমন দরকারি পরিবর্তন নিয়ে আসে, অন্যায় করার জন্য লজ্জিত হলে মনে যে পরিবর্তন আসে, তার ফলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তৈরি হয় ব্যক্তির দৃঢ় অবস্থান। মানুষের পরিশুদ্ধ মানসিকতার কারণে বদলে যায় পুরোনো সমাজব্যবস্থা। অবসান ঘটে টিকে থাকা দুর্নীতি আর অন্যায়ের।

যখন তাকাই আমাদের বর্তমান সমাজের দিকে, লক্ষ করি মানুষের মধ্যে লজ্জার যেন বড় বেশি অভাব এই সময়ে। নিজের সুবিধার জন্য নীতিহীন চর্চা এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস করার ব্যাপারে লজ্জিত হচ্ছে না অনেকেই। কোনো লজ্জা নেই চাটুকারিতায় আর তোষামোদ করায়। যারা লেখাপড়া শিখেছেন তারাও যদি ক্ষমতাশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অন্যায় আচরণের কঠোর সমালোচনা না করে নিজের সুবিধাপ্রাপ্তির প্রয়োজনে তল্পিবাহক বা মোসাহেবের মতো আচরণ করেন, তাহলে সমাজে নীতিনিষ্ঠ আর ন্যায়পরায়ণ আচরণ করার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করার কাজ কঠিন হয়ে যায়। কারণ, শিক্ষিত মানুষেরা নিজ স্বার্থের জন্য অন্যায় প্রশ্রয় দেবেন না- এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সমাজে দুর্নীতি টিকে থাকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা ক্ষমতাশালী, তারা অন্যায় আর অনিয়ম করার কারণেই। এই ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা তো শিক্ষিত। অথচ দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, অনিয়ম, যুক্তিহীনতার সঙ্গে আপস করার কারণে যাদের মনে কোনো লজ্জা বা অপরাধবোধ তৈরি হয় না, তাদের মাধ্যমে সমাজ কীভাবে উপকৃত হবে?

শহরের রাস্তায় এখন দেখা যায় অজস্র দামি গাড়ি, নিয়মিত তৈরি হচ্ছে বহু শপিংমল। নানা দোকানে আকর্ষণীয় পণ্যের সমাহার। কিন্তু এই রূপ সমাজের বাইরের রূপ। ভেতরের রূপের বিভিন্ন বিবরণ প্রায়ই পাওয়া যায় সংবাদপত্রের পাতায় যখন আমাদের পড়তে হয় দুর্নীতি আর অনিয়মের সংবাদ। আর দেখতে হয় অন্যায় হওয়ার পরও সেই অন্যায়ের সাফাই দেয়ার কিংবা অন্যায় সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকার প্রবণতা। ভালো কাজের প্রশংসা করা যেমন যৌক্তিক এবং প্রয়োজনীয়, তেমনি খারাপ কাজের তীব্র নিন্দা জানানোও জরুরি। কিন্তু যে শিক্ষিত ব্যক্তিরা অন্যায় দেখেও নিজ স্বার্থের জন্য চুপ করে থাকেন, বা অনৈতিক কাজ করা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেই সমর্থন বা প্রশ্রয় দেন, তাদের দেখে সত্যজিৎ রায়ের শাখা প্রশাখা (১৯৯০) ছবির চরিত্র প্রতাপের (রঞ্জিত মল্লিক) বলা একটি সংলাপ মনে পড়ে। দুর্নীতির সঙ্গে নিজের একজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর জড়িত থাকার কথা জেনে ফেলার পর প্রতাপ পরদিনই নিজের চাকরি ছেড়ে দেয়। কারণ সেই অফিসে একজন দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের পাশের ঘরে বসে সে চাকরি করতে চায় না। প্রতাপের বৌদি (মমতা শঙ্কর) যখন বলে সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলে তার ভীষণ ভালো লেগেছিল, তখন প্রতাপ বলে ওঠে: ‘এখনো লাগবে, বৌদি, এখনো লাগবে। বাইরে একটুও চিড় খায়নি। ভেতরে ক্যান্সার। ক্যান্সারে ছেয়ে গেছে।’

প্রতাপ যখন তার সেই সহকর্মী রমেন দত্তকে প্রশ্ন করেছিল যে তার দুর্নীতি করার কথা সত্যি কি না, তখন ভালো মানুষের রূপ ধরে থাকা সেই সুবেশী সহকর্মীটি প্রতাপকে বলেছিলেন: ‘হ্যাঁ সত্যি। কিন্তু তাতে রমেন দত্তর গায়ে একটি আঁচড়ও লাগবে না। আচ্ছা তুই কি চোখে-কানে-মগজে সব একসঙ্গে ঠুলি পরে বসে আছিস? তুই এত দিনেও বুঝলি না হাল বদলে গেছে, হাওয়া বদলে গেছে। তোর বাপের আদর্শ আজকের দিনে চলে না। আমরা যেটা করছি সেটাই আজকের নীতি, আজকের রীতি। তুই যদি এটা মানতে না পারিস তাহলে এই লাইন ছেড়ে চলে যা। কারণ, এই লাইনে তোর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সো গেট দ্য হেল আউট অব হিয়ার।’ রমেন দত্তর কথা অনুযায়ী যা ‘আজকের নীতি আজকের রীতি’ সেই অন্যায় প্রতাপ মানতে পারেনি। তাই পরের দিনই সে চাকরিতে রেসিগনেশন দিয়েছিল। বৌদিকে প্রতাপ বলেছিল যে ‘রেসিগনেশন দিয়ে সত্যিই গর্ব হচ্ছিল। যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু একটা করতে পেরেছি।’ নীতিহীন কাজ করার জন্য রমেন দত্তর কোনো লজ্জা হয় না, বরং অনৈতিক কাজই তার কাছে বর্তমান সময়ের নীতি আর রীতি। অবলীলায় বিনা সংকোচে দুর্নীতি করা এমন মানুষ কি আমাদের সমাজে এখন আমরা দেখতে পাই না? এমন লজ্জাহীন মানুষ সমাজে দেখা যায় বরং দিন দিন যেন প্রতাপের মতো মানুষদের সংখ্যাই কমে যাচ্ছে, যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে অবস্থান নিয়ে গর্ব অনুভব করবে।

দুর্নীতি এবং অন্যায়ের সঙ্গে তারাই কখনো আপস করে না যাদের মনে নীতিবোধ প্রবল এবং যাদের রুচি উঁচু মানের। আর যাদের মন রুচিশূন্য তারাই সুবিধাপ্রাপ্তির আশায় অবলীলায় অন্যায় প্রশ্রয় দিতে পারে, হতে পারে ক্ষমতাশালীদের চাটুকার। নীতিহীনতা মেনে নেয়ার আচরণ তাদের বিবেককে খোঁচা দেয় না। এখন খুব জরুরি সেই সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা, যা নাগরিকদের নৈতিকতাবোধ এবং উঁচু মানের রুচি অর্জনে সাহায্য করবে। অজস্র অর্থ ব্যয় করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার আগ্রহ আমরা দেখতে পাই এখন। কিন্তু দেখি না ‘শাখা প্রশাখা’র মতো চলচ্চিত্র তৈরি করার কোনো আগ্রহ। চিন্তাশীল চলচ্চিত্র, যা দর্শকদের মনে প্রশ্ন তৈরি করবে, তাকে চিন্তা করতে বাধ্য করবে- তেমন চলচ্চিত্র দেখার জন্য কি বর্তমান সময়ে ছাত্রছাত্রীদের অনুপ্রাণিত করা হয়? পরীক্ষায় অতি-গতানুগতিক উত্তর লিখে ভালো নম্বর পাওয়া এবং গাইডবই মুখস্থ করে চাকরি পাওয়ার চর্চা দিন দিন জোরালো হচ্ছে। কিন্তু কমছে চিন্তাঋদ্ধ সাহিত্য এবং ইতিহাস পাঠের প্রবণতা। কীভাবে তাহলে এই সমাজে কমবয়সীদের মনে সৃষ্টি হবে সুরুচি এবং সেই সুবিবেচনাবোধ, যার মাধ্যমে তারা অর্জন করবে নীতিহীনতা আর অন্যায় প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতা?  

চিন্তা এবং রুচির দারিদ্র্য দিন দিন প্রকট হচ্ছে আমাদের সমাজে, টিকে থাকছে বিভিন্ন প্রাপ্তির আশায় অন্যায় দেখেও নির্বিকার থাকার এবং অন্যায়কারীদের প্রশ্রয় দেয়ার প্রবণতা। এমন ক্ষতিকর এবং অশুভ সংস্কৃতির প্রভাবে যদি বয়স্কদের সঙ্গে কমবয়সীরাও অন্যায় করা এবং অনিয়ম, অস্বচ্ছতা টিকিয়ে রাখা ‘আজকের নীতি, আজকের রীতি’ ভাবতে শুরু করে, তাহলে এই দেশে আগামী দিনগুলো হয়ে উঠবে অসুস্থ এবং অশুভ। সৌন্দর্য এবং নৈতিকতা তখন হয়ে উঠবে আরো গুরুত্বহীন। মানুষকে শারীরিকভাবে কাবু করে ফেলার মহামারির বিরুদ্ধে এখন আমাদের লড়াই চলছে। শরীর সুস্থ রাখার জন্য সতর্ক থাকার পাশাপাশি খেয়াল রাখা প্রয়োজন নাগরিকদের মন নীতিভ্রষ্ট এবং সুবিধালোভী হয়ে ওঠার মহামারি যেন এই সমাজে সৃষ্টি না হয়।

লেখক : অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সারাক্ষণ মতামতের বৈচিত্র্যে বিশ্বাস করে। এই লেখার বিষয়ে কারো যদি কোন ভিন্নমত থাকে তাহলে অনূর্ধ্ব ৪০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান আমাদের কাছে। সারাক্ষণ আপনার ভিন্নমত সাদরে গ্রহণ করবে। আপনার ভিন্নমত প্রকাশ হবে পাঠকের অভিমত কলামে। সঙ্গে আপনার নাম, সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাবেন, যা আপনার লেখার সঙ্গে প্রকাশ হবে। ভিন্নমত পাঠানোর ই-মেইল : ‍[email protected]
মতামত বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]

জনপ্রিয়

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

১২, ১৩ এপ্রিলও লকডাউন

চলে গেলেন মিতা হক

চলে গেলেন মিতা হক

বাতিলই হলো পাকিস্তানের বাংলাদেশ সফর

বাতিলই হলো পাকিস্তানের বাংলাদেশ সফর

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে এক শহরেই নিহত ৮০

অপু উকিল করোনায় আক্রান্ত

অপু উকিল করোনায় আক্রান্ত

উত্তরায় ট্রেনের ধাক্কায় অটোচালকের মৃত্যু

উত্তরায় ট্রেনের ধাক্কায় অটোচালকের মৃত্যু

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

হবিগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই ডাকাত নিহত

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

মিতা হক রবীন্দ্রসংগীত প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

জেএমবির শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার

জেএমবির শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ
ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ

মামুনুল হক: ধর্মব্যবসায়ীর কুৎসিত চেহারা
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

মামুনুল হক: ধর্মব্যবসায়ীর কুৎসিত চেহারা

টাইম ম্যানেজমেন্ট, নাকি টাইম প্রায়োরাটাইজেশন?
জিয়া হাসান

টাইম ম্যানেজমেন্ট, নাকি টাইম প্রায়োরাটাইজেশন?

লেবাসধারীদের জন্য কি সবকিছুই জায়েজ?
প্রভাষ আমিন

লেবাসধারীদের জন্য কি সবকিছুই জায়েজ?