সব
সোমবার, ০১ মার্চ ২০২১, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭
AD

c/o দ্রাঘিমাক্ষর

সাউথ পাদ্রে আইল্যান্ড: ছয়

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২৩:১২
আমরা সবে তখন ফিরেছি হোটেলে। আমার মেয়ে এসে ফোন দিতে দিতে বলল, মা ওই আন্টিটা যাকে বলো যেন কী, ওই যে লাল শাড়ি, হলুদ বর্ডার, উনি ফোন করেছেন। ফোন দিয়ে সে নিজের রুমে ঘুমাতে চলে গেল। আমি হাসলাম, বাপের মতো সেও বাক্য বানাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ এত রাতে নিলুফার কেন আবার। মারা যাননি তো ইমতিয়াজের সেই গুরুজন। কিন্তু ফোন ধরে দেখি, না, বলছে সে অন্য কথা। বলছে মশী ভাইয়েরও করোনা রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে

২৪ তারিখ সকাল, আজ আমরা তাড়াতাড়ি উঠে গেছি। ৭টায় উঠে গেছি এই ভোরে সমুদ্রের কাছে যাব বলে। ইমতিয়াজ বলল, সে আরেকটু ঘুমাবে। আমি আর শুম হেঁটে গেলাম হোটেলের সঙ্গের কাঠের ব্রিজ দিয়ে ব্রিজের একদম শেষ মাথা পর্যন্ত, এটি সৈকতের পানি ছুঁয়ে সমুদ্রের আরো অনেকটা ভেতরে গভীরে এগিয়েছে। আমরা প্ল্যান করলাম পরেরবার এলে এই ব্রিজের ওপর শুয়ে রাত কাটানোর। ডালাস থেকেই বিচের ফোল্ডিং চেয়ার নিয়ে আসব, ওই যে আছে না কিছু রিকলাইং আউটডোর চেইজ, পাতলা হালকা, পোর্টেবল, সেগুলো নিয়ে আসব, তারপর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চাঁদ দেখব, চাঁদ দেখে দেখে ঘুমাব।

আমার বরকে এই কথা কাল রাতেই বেলকনিতে বসে যখন ছিলাম, তখনি বলেছি এই কাঠের ব্রিজটা দেখিয়ে। সে শুনেই বলেছে, তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ঘুম এলে হয়! না আসার কারণ তার মতে ওতে আমরা অভ্যস্ত নই, এত সৌন্দর্যের মাঝে কি আমরা ঘুমাই কখনো! নো, না, তবে এবারের পরেরবার ঘুমাব, তখন ছোট কুইল্ট কাঁথা বা কম্বলজাতীয় কিছু সঙ্গে থাকবে গায়ে দেয়ার জন্য। আর যেহেতু এটি হোটেলের সীমানাধীন এবং ওয়েব ক্যামেরা দিয়ে সুরক্ষিত, তাই বিপদের ভয় নেই, নিচের সমুদ্র থেকেও অনেক ওপরে ব্রিজটি। ওখান দিয়েও কেউ উঠে আসতে পারবে না আমাদের ঘুম ভাঙাতে। বেশ ভালো পরিকল্পনা! আমার মেয়ে অবশ্য বলছে তুমি ডালাসে আমাদের বাসায় আগে কখনো ট্রাই করেছ ওই রকম ঘুম নিয়ে! করোনি! তাহলে কেন ভাবছ এটা খুব হ্যাপি করবে তোমাকে?

একদম বাপের মতো হয়েছে। বললাম নতুন কিছু এ রকম ভ্যাকেশনে এলেই ট্রাই করতে হয়!

সে উত্তরে শুধু বলল, ওম মাম্মা। আমি চেয়ে আছি দেখে বলল, ওকে। যেমন তোমার খুশি। অ্যাডভেঞ্চারাস কিছু হবে। বলে হাসল।

শুমা তার পকেটে হাত দিয়ে পেয়েছে সেই আসার দিনের আমার দেয়া চিরকুটটি। জানতে চাইল, এটার কী করব, তোমার ট্রাভেলিং ব্লগের জন্য রেখে দেব কি? বললাম, না তোমার নিজের জন্য রেখে দাও। ফিউচারে কখনো হাতে পড়লে হাসবে আবার। এখন শুনেই সে হাসছে।

ও জানে না ও হাসলে ঝমঝমিয়ে মুক্তো ঝরে।

আসার সময় ‘বাকিস’ গ্যাস স্টেশনে যখন আমরা থামলাম, তখনই ওকে মনে করিয়ে দিয়েছিলাম রেস্টরুমে গিয়ে ওই চিরকুটের খামটা খুলতে, বাপ-মেয়ে তাই শুনে আকাশ-বাতাসের দিকে চেয়ে তারপর পরস্পরের দিকে চেয়ে বেশ কিছু চেনা ভঙ্গি করল, যেগুলোর মানে হচ্ছে ‘এত কিছুও করতে হবে’ এবং ‘যা করা খুবই নিষ্প্রয়োজনীয়’…এ রকম সব ভঙ্গি করে রেস্টরুমে চলে গিয়েছিল। ফিরে এসেই শুমা চোখেমুখে একমুঠো হাসি ফুটিয়ে অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বলল, তুমি চিরকুটে কী লিখেছ, ‘এটাকে রেস্টরুম বলে, বাংলায় বলে গোসলখানা’, কী এটা, শুমা হাসতে লাগল। ওর বাবা বলল, আমারটাতে লিখেছে ‘তাড়াতাড়ি এসো, আমরা বাইরে অস্থির হয়ে অপেক্ষায় আছি।’ এটি কী হলো?

পেছনে সেই শান্ত পাদ্রে শহর, আমি যে শহরের বাসিন্দা নই, কেবল পরিব্রাজিকা

আমি বললাম, ফান টাইম, কোয়ালিটি টাইম পার করলাম উইথ ফ্যামিলি, সপরিবারে মজা করলাম।

ইমতিয়াজ বলল, ইয়েস এবং সেটা রেস্টরুমে, আমরা বাথরুমে ঢুকেও তোমার হাত থেকে নিস্তার পাব না দেখছি!

মেয়েই জবাব দিল, বোঝাই যাচ্ছে, পাবা না আব্বু।

আজ বললাম, আমরা যখন কলেজে পড়তাম, তখন চিরকুট দিতাম একজন আরেকজনকে। দরকারি কোনো কথা ছিল না তাতে। জাস্ট এটা ওটা সেটা, এটাই ফান ছিল আমাদের।

শুমা খুব হাসছে, বহু বছর আগে চট্টগ্রাম কলেজে তার মা কী করত, তাই ভেবে হাসছে সে। সন্তান হাসছে, এটি দেখতে কার না খুব ভালো লাগে! নয়ন জুড়ায় সবারই।

আমার কোনো এক কথায় কথার কথা হিসেবে একদিন ডালাস বান্ধবী নিলুফার বলেছিল, তার কলেজে থাকাকালীন তো বটেই, স্কুলেও সমানে নাকি সবাইকে একধারসে চিরকুট দিয়ে যেত সে, সে দেয়ায় মশী ভাইও ছিল মনে হয়, ওর গল্পটা পুরো জানি না, ডালাসে সে কাজ নিয়ে এসে আমার বন্ধু হয়েছে। তাই তার অতীত আমার অদেখা, যতটুকু জানিয়েছে তাই জেনেছি শুধু। অবিবাহিতা ৪৫-৪৬ বছরের একজন একাকে নিয়ে প্রশ্ন তো অনেকই থাকে। আমার ভালো গুণ আমি আমার নাক সর্বত্র পাঠাই না, কানও না, খুবই ভালো মানুষের গুণ আছে আমার। অন্যের প্রাইভেসিকে সম্মান করি। সে নিজেই বলেছে দরকারি বেদরকারি কত কী থাকতো তার চিরকুটে, তাই ওইটুকুই জানি, হুম অদরকারি বেদরকারি, কী ওইগুলো থাকত আল্লাহ জানে! আপনারাও নিশ্চয়ই জানতে চান না! চান! সারছে তাহলে!

 যা-ই হোক, এখনকার সময়ের এসএমএসকে তখনকার সময়ের চিরকুট বলা যায় বোধ হয়। যায় কি!

এখন আমার মেয়ে গলফ অব মেক্সিকোর পাশে দাঁড়িয়ে হাতে রাখা চিরকুটটা এদিক-ওদিক করতে করতে বলছে, এটা কিন্তু তোমার থার্টিন মাইলস লং সিড-এর পার্ট হতে পারে! তাকে বলেছিলাম, ভ্রমণকাহিনি লিখতে গেলে দেখছি ঘোরার চেয়ে, দেখার চেয়ে, লেখার চেয়েও পড়তে হয়, জানতে হয় অনেক বেশি। প্রতিটি ইনফরমেশন খুঁচিয়ে দেখতে হয়। মনে হয় একেই বলে, বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি। ওকে ব্যাখ্যা করে ছিলাম, মূল বিষয় থেকে আনুষঙ্গিক বিষয় পড়া-দেখা-বোঝা বড় হওয়া হচ্ছে ১৩ হাত বিচি। এক লাইন লিখছি তো ১৩ লাইন পড়ছি। এখন সে ভাবনায় আছে বিচি নিয়ে বিচে।

অমর প্রেমকাহিনি! হঠাৎ দেখে মনে এল এই জুটির নাম কি নিলু আর মশী দেয়া যায়!

ওর বাবা অবশ্য গতকাল রাতেই পেয়ে গেছে উল্টো যাত্রা, কাঁকুড় বড় আর বিচি লুকানো। বিচি ছোট। এত্ত ছোট যে কেউ জানেও না যে এর বিচি আছে এবং সেটিও ওই নিলুফারকে নিয়ে। আমারও বলতে ইচ্ছা করছে যে নিলু থাকে ফার এ-ওয়ে সেই নিলুফার। সে কাছে থাকলেও তার জীবনকাহিনি বহু দূরের কিছু।

গতকাল রাতের ১০টায় কি সাড়ে ১০টায় ফোন এসেছিল নিলুফারের।

আমরা সবে তখন ফিরেছি হোটেলে। আমার মেয়ে এসে ফোন দিতে দিতে বলল, মা ওই আন্টিটা যাকে বলো যেন কী, ওই যে লাল শাড়ি, হলুদ বর্ডার, উনি ফোন করেছেন। ফোন দিয়ে সে নিজের রুমে ঘুমাতে চলে গেল। আমি হাসলাম, বাপের মতো সেও বাক্য বানাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ এত রাতে নিলুফার কেন আবার। মারা যাননি তো ইমতিয়াজের সেই গুরুজন। কিন্তু ফোন ধরে দেখি, না, বলছে সে অন্য কথা। বলছে মশী ভাইয়েরও করোনা রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। আমি শুনেই ঘাবড়ে গেলাম। মাত্র দেখা হয়েছে আসার পথে কফি কিনতে গিয়ে। এদিকে নিলুফার কাঁদছে অঝোরে। এ কেমন হলো। কোন দিক সামলাই! নিজের ভয় ঘাবড়ে যাওয়া না ওর ওই কান্না! ফোনে স্পিকার অন করে দিলাম। ইমতিয়াজেরও জানা প্রয়োজন মশী ভাইয়ের আপডেট। যদিও আমি হতবাক ভ্যাবাচেকা, এত কাঁদার কী হলো নিলুফারের। মশী ভাইকে তো সে তেমনভাবে চেনেও না। নিলুফার কেঁদে আকুল হচ্ছে আর বলছে ইল্লিগাল উনি, তাহলে ওনার যদি ভেন্টিলেশন লাগে তাহলে কী হবে। চিকিৎসার কী হবে। হঠাৎই জানতে চাইলাম তুমি চেনো আগে থেকে কি? কেন যে এমন মনে হলো তাও জানি না। একটু চুপ থেকে সে দিল একদম নতুন খবর, বলল, সেই গ্রাম উপশহর থেকেই চিনি, একই গ্রামের-পাড়ার আমরা। এ দেশে পড়তে এসে আর ফেরেননি উনি। আরো বলল সে, আমিও একসময় এলাম পিছু পিছু, তবে অনেক দেরিতে, দেখলেও আমরা ভাব করি পরস্পরের অচেনা বা স্বল্প চেনা, এখানেই চিনেছি যেন, অতীত অচেনা।

পানিময় যাদের জীবন, মাছ তারা নাইবা ধরে কেমন করে! সাউথ পাদ্রের এই নিত্য দৃশ্যে আনন্দরত পাতাবাহারের জগৎ ইমতিয়াজের ক্লিকে কথা কইছে যেন

হ্যাঁ বুঝলাম। জি, আপনারা যা বুঝলেন আমিও তাই বুঝলাম। পাড়া-কাহিনি পড়া আছে সবারই।

এখন থেকেই আমি কোনো একটা প্রেমের উপন্যাস শুরু করতে পারি। ৩০০ পৃষ্ঠার বিশাল এক বাঁধভাঙা প্রেমকাহিনি। আমার এতে তেমন উৎসাহ নেই, এটা খুব চেনা আঙিনা। ঘরে ঘরেই এ ধরনের বহু কাহিনি রয়েছে। তবে এটা ঠিক, মশী ভাই যে এত বড় বর্ণচোরা, তা আমার জানা ছিল না!

আমার বর এবার বলল, এবার তাহলে তোমার পছন্দনীয় হবে, সিড ছোট, ঘটনা বড়। ১৩ হাতই গল্প।

আমি কিছু বলার আগেই বলল, তবে আর্জেন্ট আমাদের কোয়ারেন্টাইন হতে হবে, আইসোলেশনে যেতে হবে, টেস্ট করতে হবে, কালই কোনো একজন এই পাদ্রের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

আজ আমরা দিনভর যে এত আনন্দ করলাম, মুহূর্তে সব উবে গেল। বলা যায় না, দরজার ওপারেই করোনা দাঁড়িয়ে রয়েছে মৃত্যু হয়ে। করোনা হলেই যে মরে যাব তা না, তারপরও কোরোনার সঙ্গে মৃত্যুযোগও আছে প্রচুর। এই মৃত্যুতে অনেকে বলছে শহীদের খেতাব পাবে। ভালো ভালো সান্ত্বনার বাণী মানুষ জানে ও খুঁজে নিতে প্রয়োজনে। থাক, এভাবে বলা মনে হয় ঠিক হচ্ছে না। লাখ লাখ মানুষ মারা গেছে। আল্লাহ তাদের সবাইকে বেহেস্ত প্রদান করুন। শহীদের সন্মান প্রদান করুন। অসহায়ের মতো ওনারা চলে গেছেন। আমরাও অসহায়ের মতো চেয়ে চেয়ে দেখেছি। ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার যেন আমরা। ভ্যাকসিনের দেখা নেই, রয়েছে মতবিরোধ। পক্ষে-বিপক্ষে বহু মত, বহু পথ।

একটি কার্যকর সফল প্রতিরোধকের প্রত্যাশায় সজাগ সময়কাল মানবজাতি।

এদিকে আমার বর অনেক ফোন করেছে, টেস্ট কোথায় কী করবে এসব নিয়ে। অনেকে থাকে যারা নিজেরা আক্রান্ত হলেও টের পায় না, তবে হেঁটে চলে ছড়াতে থাকে। আমার হঠাৎ মনে পড়ল ওই অন্ধ বাচ্চাগুলোর মায়েদের কথা, কোনোভাবেই ওদের সংক্রমিত হতে দেয়া যাবে না। এতজন থাকতে ওদের কথাইবা কেন এল মনে, জানি না।

আজই ওদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছে। আমাদের ছোঁয়া টিকিট ওদের হাতে গেছে। হয়তোবা তাই। অথবা ওই তিনটি অন্ধ শিশুর মায়ায়।

বাডিং সেন্টারের টাওয়ারে দাঁড়িয়ে বাঁয়ে তাকালে আমাদের হোটেল ছেড়ে পেছনে গলফ অব মেক্সিকোর পানি, ডানে লেগুনা মাদ্রের পানিতে এক ঝুপড়ি। দ্বীপের প্রস্থ এতটাই কম বলে হে পরিব্রাজক আপনি ভয়ও পেতে পারেন!

রহমান ভাইকেও ইমতিয়াজ ফোন করল। উনি এই মশী ভাইয়ের করোনার বিষয়ে কিছুই জানেন না। আমি বললাম, তুমি ডাইরেক্ট মশী ভাইকেই ফোন দাও। ইমতিয়াজ হাসল, বলল, ওনাকে কী বলব, ভাই আপনি আমাকে কেন করোনা ধরালেন! নাকি বলব আপনার আসল এক্সকে না দেখিয়ে জগৎময় এক্স ওয়াই জেড সবাইকেই দেখালেন! আর ওনার নাকি নামও মনে থাকে না, তাই বানিয়েছেন নীল শাড়ি লাল পাড়, নীলা।

আমি বললাম নীলা না, নিলুফার।

ইন্টারনেটে ডাক্তারের সার্চ দিতে দিতে ও বলল, হবে একটা কিছু। আমরা মারা গেলে ওনার নাম হবে নীলফামারী।

আর ঠিক তখনই মশী ভাইয়ের ফোন। ফোন করেছেন আমাকে, হেসে বলছেন, আর বলবেন না ভাবী, আজ নীলুর সঙ্গে দেখা, ওকে ভয় দেখাতে বলে ফেলেছিলাম করোনা হয়েছে, আর বাঁচব না। ও যে ভয় পেয়ে এমন রাষ্ট্র করে ফেলবে আমি তো তা বুঝতেও পারিনি। আমাকে দেখলেই তো মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। বুঝব কেমন করে আমি মরলে ওর কষ্ট হবে। আপনিই বলুন।

আমার তো আর খেয়েদেয়ে কাম নাই যে মাঝরাতে ওনাদের প্রেমের কঙ্কাল নিয়ে এটা-ওটা বলব, টাটা বাই বাই বলে তারপর নীল নদে ভাসাতে যাব কেঁদে কেঁদে। ফোনের স্পিকার আবার অন করে দিলাম। উনিই সাফাই গেয়ে যাচ্ছেন, ভাইকে বলতে একটু লজ্জা করছিল, তাই আপনাকে ফোন করলাম। তবে আমি যা জানতে ব্যস্ত তাই উনি বললেন, আমার করোনা হয় নাই, মিছা কথা বলছিলাম। আপনারা ভয় পাননি তো? নীলু বলেছে, সে আমাকে আরো বেশি করে ঘৃণা করবে এবার থেকে।

বললাম, আমার মনে হয়, আপনারা পরস্পরকে যত দিন ঘৃণা করবেন, তত দিনই আমরা যেমন ভালো থাকব, আপনারাও ভালো থাকবেন। আরো বললাম, আপনার নিলুফারের থেকে দিনে দিনে প্রতিদিন ফার ফার ফার অ্যাওয়ে থাকা দরকার, তাই ওর নাম নিলুফার, বুঝেছেন? উনি শুনেই বললেন, আমার নাম তা হলে ফারদিন, আজ থেকে বলিউডের হিরো জিরো ফারদিন খান। আমি বিরক্ত হয়ে আমার বরের দিকে তাকালাম। অন্য সময় হাসতাম কিন্তু করোনার দিনে এ রকম হাসাহাসি অপছন্দ।

আমার বর ফোন নিয়ে ওনাকে বললেন, আমি তো ভেবে অস্থির হচ্ছিলাম এখানে কোথায় কোন ডাক্তার আছে, কে আমাদের ইনস্যুরেন্স নেবে এসব, সকালে কার কাছে যাব টেস্ট করাতে কত কি ভাবনায় ছিলাম। থ্যাংকস আপনাকে নেগেটিভিট ইনফরমেশনটা জানানোর জন্য। যেহেতু স্পিকারে রয়েছে ফোনটা, শুনতে পাচ্ছি উনি বলছেন, আরে ভাই, দেশে আমার শালার শালা গেছে করোনা টেস্ট করাতে। ডাক্তার বলেছে, ৩ হাজার ৫০০ টাকা লাগবে। কী করেছেন জানেন, দুই হাতে ডাক্তারের কম্পাউন্ডারকে জড়ায়ে ধরে কাঁইন্দা উঠে হাঁচি কাশি সব দিয়ে চলে এসেছে। ১৪-১৫ দিন পরে গিয়ে দেখে ওই লোক সুস্থ, আর কী বুঝে গেল চিন্তার কিছু নেই। আমার বর অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। আমি বললাম, এটা ভুয়া কথা। ফেসবুক থেকে কাট কপি করেছেন উনি। আমার বরের ফেসবুক নেই বলে যার যা খুশি গুলপাট্টি মেরে যাচ্ছে ওর কাছে। ও অবশ্য হাসতে লাগল।

এত কাণ্ড করতে হয়েছে আমাদের গেল রাতে ওই নিমপাতা তিতা তিতা নিয়ে। এখন থেকে নিমপাতা তিতা তিতা বললেই বুঝতে হবে এদের নিয়ে কিছু একটা। এটা একটা সংকেত। সাংকেতিক নামটা বেশ গোপনে আমার বরের কাছে পাচার করেছি। আপনারাও মনে রাখবেন।

আমরা মা-মেয়ে হোটেলে ফিরছি, দেখি যে তিন মাকে নিয়ে করোনাকালে ভয় পেয়েছি গত রাতে সবচেয়ে বেশি, সেই তিন মা সেই অন্ধ তিন পদ্মলোচনসহ এসে হাজির আমাদের কাছাকাছি। আমার মেয়ে বলে দিল বাংলায় সঙ্গে সঙ্গে, ওদের হাতে কার্ড আছে, বুঝতে পারছ ওরা কেন আসছে? যা বলার তুমি বলো, আমি ডিল করতে চাই না। ওদের মায়েরা একদম কাছে এসে বলল, আমাদের তিন ছেলে তোমাদের থ্যাংকস জানাতে চায়। কাল ডলফিন ওদের অনেক আনন্দ দিয়েছিল। আমি তিনজনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলাম ওদের সমান হতে। একজন বলল, তোমার দয়ায় আমরা আরেকটি সুন্দর দিন দেখলাম। আরেকজন বলল, তোমার কারণে পৃথিবী খুব সুন্দর হলো। শেষের জন বলল, মানুষই মানুষের আপনজন, এটা আমাদের বাঁচার শক্তি। তিনজনের কার্ডেও তাই লেখা। আমার খুব কান্না পেয়ে গেল। শুমা আগেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। আমি জানলাম ওদের সম্পর্কে ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই, চিনলাম ওদের তিনজনকে। ওরা তিন বান্ধবী, এডাপ্ট করেছে এদের, দত্তক নিয়েছে তিন শিশুকে তিনটি ভিন্ন দেশ থেকে তিন-চার বছর আগে। বছর তিরিশের তিনজন অনবদ্য মানুষ। বাচ্চাগুলো নাম বলল জেরি, হেরি, এরিক। হায়, কত কাহিনি আছে পৃথিবীতে! কত রকমের কত কাহিনি! যে দেখতে পারে তা অন্তর্নিহিত এই যাপিত জীবন, তার কাছে কী যে বৈচিত্র্যময় এই জগৎ, এই দুনিয়া কখনোই বোরিং নয় তার কাছে। জানতে আর চাইলাম না ওরা বিবাহিতা কি না। মায়ের মমতা বিলাতে গেলে বিয়ে করতে হবে, বাচ্চার জন্ম দিতে হবে, তাইবা কেন ভাবব এই এক আকাশ খোলা বিশাল বিপুলা পৃথিবীর ওপরে দাঁড়ায়ে!

আমার কেবল মনে হলো,

বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে… এটাই ধ্রুব সত্য।

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সহোদর সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী এই কথাটিই আমার মাথা ছুঁয়ে ঘুরে গেল কয়েকবার।

আমি ভিন্ন দেশে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন কিছু মানুষের সঙ্গে বসে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’ (পুস্তক আকারে প্রথম প্রকাশ: ১৩৫১ বঙ্গাব্দ/১৯৪৪ ইং) থেকে মনে এল-

“…এমত সময়ে কুলিদের কতকগুলি বালক বালিকা আসিয়া আমার গাড়ী ঘেরিল। ‘সাহেব একটি পয়সা’ ‘সাহেব একটি পয়সা’ এই বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। ধুতি চাদর পরিয়া আমি নিরীহ বাঙালী বসিয়া আছি, আমায় কেন সাহেব বলিতেছে তাহা জানিবার নিমিত্ত বলিলাম, ‘আমি সাহেব নহি।’ একটি বালিকা আপন ক্ষুদ্র নাসিকাস্থ অঙ্গুরীবৎ অলঙ্কারের মধ্যে নখ নিমজ্জন করিয়া বলিল, ‘হাঁ, তুমি সাহেব।’ আর একজন জিজ্ঞাসা করিল, ‘তবে তুমি কি?’ আমি বলিলাম, ‘আমি বাঙ্গালী।’ সে বিশ্বাস করিল না, বলিল, ‘না, তুমি সাহেব।’ তাহারা মনে করিয়া থাকিবে যে, যে গাড়ি চড়ে, সে অবশ্য সাহেব।

এই সময় একটি দুই বৎসর বয়স্ক শিশু আসিয়া আকাশের দিকে মুখ তুলিয়া হাত পাতিয়া দাঁড়াইল। কেন হাত পাতিল তাহা সে জানে না, সকলে হাত পাতিয়াছে দেখিয়া সেও হাত পাতিল। আমি তাহার হস্তে একটি পয়সা দিলাম, শিশু তাহা ফেলিয়া দিয়া আবার হাত পাতিল, অন্য বালক সে পয়সা কুড়াইয়া লইলে শিশুর ভগিনীর সাথে তাহার তুমুল কলহ বাধিল। এই সময় আমার গাড়ী অপর পাড়ে গিয়া উঠিল।’

…যে বাঙালিকে একদা বলেছিল শিশুরা সাহেব, আজ সেই সাহেবের শিশুদের কাছে আমি এক বিদেশিনী। দর্শন বদলে যায় সময়ে, দর্পণে, জায়গাভেদে ।

এগিয়ে গিয়ে শুমকীর কাছে গেলাম। শুম বলল, কার্ডগুলোতে ওই লেখাগুলো প্রিন্টেড, কার্ডের ভেতরই ছাপা ছিল, ওদের নিজেদের লেখা নয়, শুধু নামটা ওরা লিখেছে। কথাগুলো ওরা নিজেরা লিখলে না হয় বুঝতাম তোমার কাঁদার কারণ আছে। এখন কান্না থামাও। এই কান্নাটুকু থেকে লুকাতেই কিন্তু সে আগেই সরে গেছে। যেখানেই থাকি না কেন, বাংলার নাকি কান্না যাবেই সঙ্গে সঙ্গে।

 শুমাকে বললাম, দেখেছ কতজন আছে জানেই না দেখেওনি কত সুন্দর এই পৃথিবী! আমরা কত ভাগ্য নিয়ে জন্মেছি, তাই না!

মেয়ে বলল, হয়তোবা ওদের অনুভব আমাদের চেয়ে বেটার, ওরা আরো ভালো বুঝে চোখ বুজে। তাকানো আর দেখা এক নয়, মা।

আমি আর কী বলি, বাপের মতোই হয়েছে। বাপ কা বেটি।

দূরে দেখলাম তিন মা তিন বাচ্চা পরস্পরের হাত ধরে লম্বা এক আলোর মিছিল করে সমুদ্রের পানি ছুঁতে যাওয়ার তাগিদে বালুতে নেমে পড়েছে।

মেয়ে বলল, দে আর হ্যাপি, মা। তোমার কি এখনো বাংলাদেশের সেই কোনো এক ফিল্মস্টার আছেন না, তার মতো করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে? আমি হাসি, তারপর বলি শাবানা স্টাইলে কাঁদতে ইচ্ছা করছে, আকুল হয়ে বিকুলভাবে, সমুদ্রকূলে এলেই তো মনটা কূল হারায়।

এত আনন্দের মাঝে এলেই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে, দেশের কথা মনে পড়ে। সৌন্দর্য তো আমাকে ভুলিয়ে রাখার কথা দেশ, মা, পরিচিত স্বজন, কিন্তু হয়েছে উল্টো। ওদেরই মনে পড়ে যায়। আমি দেখছি নয়ন জুড়িয়ে জড়িয়ে, ওরা দেখতে পাচ্ছে না নয়ন মেলে। হায়। আমার মায়ের আমেরিকায় আসার কথা ছিল, ওনাকে নিয়েই বেড়াতে আসার কথা ছিল এখানে। শুমের রুমে দুটি খাটও তাই। কিন্তু করোনার কারণে সে আর বাংলাদেশ থেকে আসতে পারল না। আম্মাকে মনে পড়ে। এত সৌন্দর্য আম্মা দেখল না। আমার আম্মা অসম্ভব সুন্দর একজন মানুষ, এই অপার সৌন্দর্যে তাকে বড় মানাত। মানত নিয়ত প্রত্যাশা থাকল পরেরবারে তাকে আনার।

আমি আর শুম সমুদ্র পেছনে ফেলে হোটেলের দিকে এগোলাম, আজ আমরা হোটেল ছেড়ে দেব। হোটেলটার জন্য মায়া লাগছে। রাতের বেলা একা একা নীরবে এই একবুক পানিতে ভরা গভীর এক খাতের পাশে দাঁড়ায়ে থাকবে সে।

শিকড়ের শিকল, আসলেই বেঁধে রাখে। বেঁধে রাখে, ধরে রাখে, প্রাণের দড়ি ধরে টান দেয়, বলে মনে করায় ফেলে আসা দিন, পিছুটান তান তুলে তবলায় বেহালায় তানপুরার সাধনায়। ভাবি প্রায়ই, দেশে গিয়ে পুরা চার মাস থাকব। টানা চার মাস। ধূলিময় আকাশ, প্রচণ্ড ট্রাফিক, হাজারো মানুষের ভিড়ে ঘুরব আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। রাস্তার পাশের ঝুপড়িঘরের মতো দোকানগুলো থেকে সমুচা খাব আম্মাকে নিয়ে, করোনাকে পাত্তা না দিয়েই খাব। লাল লাল বরই কিনব বান্ধবী সোনালীর সঙ্গে। পৃথার (বান্ধবী) সঙ্গে রিকশায় হুট ফেলে ঘুরব। তাই দেখে নাদিম ভাই (পৃথার বর) আর ইমতিয়াজ ভ্রু কুঁচকে চেয়ে থাকবে, থাকুক, আমরা ঘুরব আমাদের মনের আনন্দে। জিনাতের (বান্ধবী) বাসায় গিয়ে বহুদিনের না দেখা চট্টগ্রামে দুই দিন ঘুমাব, পুরো দুই দিন দুই ঘণ্টা আমার ছোটবেলাকার গন্ধ গায়ে মেখে ঘুমাব। শিকড়ের শিকল বড়ই মজবুত। যতই ছুঁই দূরদূরান্তের দ্রাঘিমাংশ, অক্ষাংশ, নিজ অক্ষ দ্রাঘিমাতেই মন থেকে যায় বন্দী, বন্ধক।

বাকিস মাস্ক পরা বিভার, ডিস্পেন্সার যা ছুতে হয় আসা যাওয়ায়, দিগন্ত ছোয়া রাস্তা, বেড়ালে মাস্কে নীল ফুল বসাতে হয়

ইমতিয়াজ উঠে পড়েছে অনেকক্ষণ, বলল, যেখানেই যাও শিকড় গজাবে তোমার, যে শিকড় গড়ে সে সবক্ষেত্রেই গড়ে, শিকড়ময় জীবন, এখানে এসেছ তো ডালাসের জন্য মায়া হচ্ছে তোমার, ঢাকার কথা মনে পড়ছে, কোনটাকে অস্বীকার করবে? এরপর আমার দিকে চেয়ে দুষ্টমির এক হাসি দিয়ে বলল, ক্রমে দেখবে বিশ্বময় শিকড় গজিয়ে ফেলে বিশাল এক মহিরুহু হয়ে গেছ। চাঁদ মঙ্গলগ্রহ থেকে তোমাকে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে দিলরুবা বৃক্ষ। সবাইকে শীতল বাতাস দিচ্ছে। বাতাসে তোমার পাতা দুলছে, পিত পত্ পত্ শব্দ করে ঢুলছে দুলছে। কাক-চড়ুই কাছে আসতেই তাড়াতে ওদের বা একহাত দেখে নিতে পুরো গাছ সুন্দরী দুলছে ভয়ংকর ভূমিকম্প তুলে।

আমি ঠিক করেছি এই লোকের সঙ্গে আর কথা বলব না! আপনারা কী বলেন!

ছবি: ইমতিয়াজ আহমেদ

লেখক পরিচিতি: দিলরুবা আহমেদের কর্মজীবনের সূচনা হয়েছিল প্রভাষক হিসেবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে আইটি ফিল্ডে কর্মরত। ইতোমধ্যে তার প্রকাশিত গ্রন্থাবলির মধ্যে টেক্সাস টক, আমার ঘরে এসো, আঠার, ঝুমকোলতার সারাটা দিন, মাছের মায়ের পুত্রশোক, এসো হাত ধরো, হেঁটে চলেছি বন জোসনায়, ব্রাউন গার্লস, গ্রিনকার্ড, টেক্সান রানী ও ব্লু বনেট, বলেছিল, প্রবাসী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

শিল্প ও সাহিত্য বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]
AD

সাম্প্রতিক

পাস্তা চিকেন স্যালাড

পাস্তা চিকেন স্যালাড

অসহযোগের প্রথম দিন: বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জনগণ

অসহযোগের প্রথম দিন: বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জনগণ

দেশপ্রেম এবং সাহিত্যের দায়

দেশপ্রেম এবং সাহিত্যের দায়

এবারও মশা কমেনি

এবারও মশা কমেনি

নরসিংদী পৌরসভায় নৌকা প্রার্থীর বিজয়

নরসিংদী পৌরসভায় নৌকা প্রার্থীর বিজয়

পুনর্বাসন না করেই উচ্ছেদের প্রস্তুতি, বিপাকে লালদিয়ার চরবাসী

পুনর্বাসন না করেই উচ্ছেদের প্রস্তুতি, বিপাকে লালদিয়ার চরবাসী

কালীগঞ্জ পৌরসভার নতুন মেয়র এসএম রবীন

কালীগঞ্জ পৌরসভার নতুন মেয়র এসএম রবীন

স্যালুট মার্কেল! স্যালুট!

স্যালুট মার্কেল! স্যালুট!

আমার সেরা বন্ধু বই

আমার সেরা বন্ধু বই

কী মধুর বাংলা ভাষা

কী মধুর বাংলা ভাষা

সাউথ পাদ্রে আইল্যান্ড: পাঁচ

সাউথ পাদ্রে আইল্যান্ড: পাঁচ