সব
সোমবার, ০১ মার্চ ২০২১, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং আমাদের সামাজিক অবস্থা

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৭:০০
বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে যুক্ত করে দেয়ার একটি নির্মম বাস্তবতাও আমরা দেখেছি। গ্রামের সাধারণ কোমলমতি মানুষের কাছে দুটো কুরআন-হাদিসের কথা বলে ভোট নিয়ে সংসদেও যেতে দেখেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করাও দেখেছি। যে দলের নেতারা ধর্মকে শুধু লেবাস হিসেবে ব্যবহার করে। এ জন্যই এ কথাটি বলছি, যদি তারা ধর্মকে মনেপ্রাণে ভালোবেসেই রাজনীতি করত, তাহলে তাদের সবার সন্তান মাদ্রাসা ছেড়ে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষা গ্রহণ করত না

সম্প্রতি একটি তথ্য দেখে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেলাম। অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত এবং রওশন আরা, এম তাহের উদ্দিন, ফরিদ এম জাহিদ, মুহাম্মদ বদিউজ্জামান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের মাদ্রাসাশিক্ষার রাজনৈতিক অর্থনীতি’ গবেষণাগ্রন্থের তথ্যানুযায়ী দেশে প্রতি তিনজন ছাত্রের একজন মাদ্রাসাছাত্র। অর্থাৎ শতকরা হিসাবে দেশে অধ্যয়নরত মোট ছাত্রছাত্রীর প্রায় ৩৩ শতাংশের ওপরে মাদ্রাসাছাত্র। শুধু তা-ই নয়, সংখ্যাটি বৃদ্ধির হার নাকি সাধারণ শিক্ষার চেয়ে তুলনামূলক বেশি। গ্রন্থের তথ্যমতে, মোট মাদ্রাসাছাত্রের সংখ্যাটি প্রায় ১ কোটি। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ৫২ লাখ কওমি মাদ্রাসার ছাত্র। যে কওমি মাদ্রাসার ওপরে সেই অর্থে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। এই গবেষণা রিপোর্টটি ২০০৮ সালের দিকে করা। ইংরেজি ভাষায় এটি গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছে ২০১১ সালে। বাংলায় ভাষান্তর হয়ে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালে। গ্রন্থাকারে এটি যখনই প্রকাশিত হোক না কেন রিপোর্টটি আজ থেকে অনেক বছর আগের করা। কল্পনা করতে এতটুকু অসুবিধা হচ্ছে না যে আজকে এত দিন পরে এই পরিসংখ্যানটি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। সামগ্রিক পরিপাশ্বিকতা বিবেচনায় ধারণা করি, গত এক যুগে মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৪০ শতাংশের ওপরে পৌঁছে গেছে। ধরে নিচ্ছি এই মুহূর্তে দেশে অধ্যয়নরত মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা যদি ৪ কোটি হয়ে থাকে তাহলে ৪০ শতাংশ মাদ্রাসাছাত্র হলে সংখ্যাটি হবে ১ কোটি ৬০ লাখ। অর্থাৎ মোট শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশ মাদ্রাসা থেকে বেরোচ্ছে।

মনে রাখতে হবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। তেমনি এটিও প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়ায় এবং বর্তমান সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় এটি এক বিরাট সমস্যার দিকে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ত্রিধারায় বিভক্ত। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম এবং অপরটি মাদ্রাসা মাধ্যম। এর মধ্যে বাংলা মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থাটিকেই বলা যায় মূলধারার। সরকারের মনিটরিং বলি আর দৃষ্টি বলি, এর বেশিভাগই থাকে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থাটি পরিচালিত হয় ভিনদেশি কারিকুলামে। যার সঙ্গে আমাদের সংযোগটি নেই বললেই চলে। ব্যয়বহুল এই মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ওসব দেশের ভাবধারা এবং চিন্তাচেতনায় পাঠদান করা হয়। অর্থনৈতিকভাবে সমাজের অপেক্ষাকৃত একটি বিশেষ উচ্চ শ্রেণির সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে থাকে। তবে ইদানীং এ ধরনের শিক্ষা খানিকটা সহজলভ্য হওয়ায় এবং অলিগলিতে এমন শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠায় আজকাল অবশ্য অনেক মধ্যবিত্তও কোনো প্রকার চিন্তাভাবনা না করেই সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠাচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যম অভিভাবকরা শিশুকাল থেকেই শিক্ষার্থীদের মগজে স্থাপন করতে সক্ষম হয় যে, তোমার জন্য এই দেশ নয়; তুমি এই দেশে থাকবে না টাইপের ধারণা। যার কারণে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ওসব দেশেই স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং একটি পর্যায়ে স্থায়ী হয়েও থাকে। যার কারণে এই শ্রেণিটি দেশের সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। কিন্তু মাদ্রাসাশিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এ দেশেই থাকে এবং সমাজে তাদের প্রভাব অনেক। সমস্যাটা এখানেই। বাঁশের চেয়ে কঞ্চি মোটা- এমন একটি কথা আমাদের সমাজে বহুকাল যাবৎ প্রচলিত আছে। অর্থাৎ বাঁশ হচ্ছে মূল জিনিস। মূল বাদ দিয়ে যদি কঞ্চি মোটা হয় তাহলে সেই বাঁশ কোনো কাজে লাগে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অংশগ্রহণের জায়গাটিতে অনেক ক্ষেত্রে এমনটা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় মাদ্রাসাশিক্ষার কতগুলো ভাগ আছে। নিচে সেগুলো একটু দেখে নেয়া যাক।

১. নূরানী/তালিমুল কুরআন/ফোরকানিয়া মাদ্রাসা- এমন বিভিন্ন নামে কুরআন শরিফ শুদ্ধ উচ্চারণে পড়ানোর শিক্ষাটা দিয়ে থাকে। এগুলোকে মক্তবও বলা হয়। বিভিন্ন মসজিদকেন্দ্রিক এই মাদ্রাসাগুলো মূলত ছোটদের কুরআন শরিফ পাঠ শিক্ষাকেন্দ্র। তবে বয়স্করাও শুদ্ধ করে কুরআন পড়া শেখার জন্য এ ধরনের মাদ্রাসায় যেতে পারে।

২. হাফেজি মাদ্রাসায় কুরআন শরিফ মুখস্থ করানো হয়। কুরআন মুখস্থ হলে তাদের হাফেজে কুরআন বলা হয়। এখানেও মূলত শিশুদের পড়ানো হয় এবং কুরআন শরিফ মুখস্থ হতে দুই থেকে চার বছর সময় লাগে। হাফেজ হওয়ার পর বেশিভাগ আলিয়া মাদ্রাসা অথবা কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে।

৩. মাদ্রাসাশিক্ষার আধুনিক সংস্করণটি হলো আলিয়া মাদ্রাসা। যেখানে সাধারণ স্কুল, কলেজের সঙ্গে মিল রেখে সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়। দাখিল-এসএসসি, আলিম-এইচএসসি, ফাজিল-ডিগ্রি এবং কামিলকে মাস্টার্সের সমমান দেয়া হয়। সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে খানিকটা সামঞ্জস্য থাকায় এখান থেকে পাস করা একজন শিক্ষার্থী যদি মনে করে শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, তাহলে সেটিও করতে পারে। আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড রয়েছে। দেশে সরকারি, এমপিওভুক্ত এবং বেসরকারি মাদ্রাসা আছে। এই মাদ্রাসাগুলো পুরোপুরিই সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন।

৪. আরবি শব্দ কওম থেকে কওমি মাদ্রাসার নামকরণ হয়েছে। কওম শব্দের অর্থ গোষ্ঠী, গোত্র, জাতি, সম্প্রদায়, জনগণ ইত্যাদি। মাদ্রাসাও আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো অধ্যয়নের স্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল। সুতরাং কওমি মাদ্রাসার মানে হলো গোষ্ঠী, গোত্র, জাতি, সম্প্রদায়, জনগণের বিদ্যাপীঠ। কওমি মাদ্রাসা সাধারণত সরকারি কোনো অনুদান গ্রহণ করে না। পুরোপুরি জনসাধারণের বিভিন্ন প্রকার দান, অনুদানে পরিচালিত হয়। হয়তো এ কারণেও এ ধরনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে। মোট মাদ্রাসাশিক্ষার অর্ধেকের বেশি ছাত্রছাত্রী কওমি মাদ্রাসায় পড়ে। এই বিপুল ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো হাত নেই। অনিয়ন্ত্রিতভাবে শিক্ষাব্যবস্থাটি গড়ে উঠতে উঠতে এটি খানিকটা যেমন খুশি তেমন শিক্ষাব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

মাদ্রাসাশিক্ষার যে বিভিন্ন ভাগ এর মধ্যে প্রথম দুটি নিয়ে তেমন একটা শঙ্কা নেই। কারণ এ দুটিই শিশুদের জন্য। তা ছাড়া, পৃথিবীতে যেহেতু ধর্ম আছে সেহেতু ধর্মগ্রন্থ শুদ্ধভাবে পাঠদানের ব্যবস্থাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান থাকতেই পারে। আবার ধর্মগ্রন্থ মুখস্থ করে হাফেজ হওয়ার ব্যবস্থাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানও ধর্ম পালনের জন্য প্রয়োজন। এ জন্যই প্রথম দুটি ধারা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। বিতর্ক বলি, আলোচনা বলি সেটি আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা নিয়ে হতে পারে। আলিয়া মাদ্রাসা সরকার পরিচালিত শিক্ষা বোর্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে। তবে মাঝে মাঝেই নিয়ন্ত্রণের বাইরেও ধর্মীয় উন্মাদনা ও উগ্রবাদিতার মতো নানা কর্ম পরিচালিত হয় সেখানে।

মাদ্রাসাশিক্ষার কারিকুলাম নিয়ে বিস্তর অভিযোগ শোনা যায়। যে আলিয়া মাদ্রাসায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে সেখানেও মনগড়া অনেক বিষয় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে মিল আছে- এমন বিষয়গুলোতে সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থী একভাবে পড়ছে আবার সেই একই বিষয় অন্যভাবে পড়ানো হয় মাদ্রাসায়। আর কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম সম্পূর্ণ ধর্মভিত্তিক। ভাষাগতভাবে সেখানে আরবি এবং উর্দুকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এ ছাড়া কিছুটা ফারসিও পড়ানো হয়। সেখানে বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এমন কোনো পাঠ নেই বললেই চলে। বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং অন্যান্য বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের ধারণা দেয়া হয়। যার কারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠী ধর্মভিত্তিক জীবিকার বাইরে অন্য কোনো পেশায় যেতে পারে না। কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির গণিত বইয়ের ২৩ পৃষ্ঠার ২৩ নম্বর অঙ্কটি চোখে পড়ল। তাতে দেখলাম প্রথম শ্রেণির শিশুদের জিহাদ এবং শত্রুকে মেরে ফেলানোর অঙ্ক শেখানো হয়েছে। প্রথম শ্রেণির ছোট্ট শিশুটি জিহাদ কী জিনিস সেটি বোঝার কথা নয়। অঙ্কটি শিখতে গিয়ে নিশ্চয়ই শিশুরা জিহাদ কী জিনিস, সেটিও বুঝতে চাইবে। আবার এতটুকু বয়সের শিশুর কাছে মেরে ফেলানোর মতো সহিংসতা ব্যবহার করা হয়েছে। যা সত্যিই দুঃখজনক। শোনা যায় এমন নানা রকম অসংগতিপূর্ণ কারিকুলামে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পাঠ দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের মগজে পরকালের জীবনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পাঠ দেয়া হয়। কিন্তু ইহকালের জীবনকেও যে অস্বীকার করার উপায় নেই। তা ছাড়া, নানা কারণে মোট শিক্ষার্থীর সিংহভাগ শিক্ষাজীবনের মাঝপথেই ঝরে পড়ে। এতটুকু শিক্ষা নিয়ে সাধারণ মানুষকে না পারে ধর্মের সঠিক এবং শুদ্ধ পাঠ দিতে, না পারে অন্য কিছু করতে। যেহেতু অন্য কিছু করতে পারে না, সেহেতু মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, ছোটখাটো মক্তব-মাদ্রাসার শিক্ষক ইত্যাদি ধর্মসংক্রান্ত কাজেই যুক্ত থাকে। ধর্ম সম্পর্কে অল্প বিদ্যার কারণে অনেক সময় এই শ্রেণির মানুষগুলো থেকে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অন্য ধর্মের প্রতি হিংসা এবং বিদ্বেষও ছড়ানো হয়। তৈরি হয় সামাজিক অস্থিরতা।

কওমি মাদ্রাসার ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় খুব বেশি আপত্তিকর বলে মনে করি। তা হলো সরকারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। আপনি একটি রাষ্ট্রে বসবাস করবেন কিন্তু সেই রাষ্ট্রের নিয়মকানুন মানবেন না, তা তো হতে পারে না। দেশের সব শিক্ষাব্যবস্থার ওপর যদি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থাকে তাহলে কওমি মাদ্রাসার ওপর কেন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না? কওমি মাদ্রাসা পরিচালিত হয় বহুধাবিভক্ত বেসরকারি শিক্ষা বোর্ড নামের একশ্রেণির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরের যুগান্তর পত্রিকার এক রিপোর্টে জানা যায়, সারা দেশে গড়ে ওঠা কওমি মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ ও সনদ দেয়ার লক্ষ্যে ১৯টি শিক্ষা বোর্ড আছে। সংখ্যাটির ব্যাপারে নানা সময়ে নানা গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্র কখনো কখনো এই শিক্ষাব্যবস্থাটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করলেও বেসরকারি এই শিক্ষা বোর্ডগুলো তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের জন্য বরাবরই রাষ্ট্রের সহায়তা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এসেছে এবং তারা সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করতে চায় না। কেন চায় না, সেটিও এক বিরাট প্রশ্ন। সেই ব্যাপারেও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

দেশে বর্তমানে কওমি মাদ্রাসার আসলে সঠিক সংখ্যাটি কত, সেই পরিসংখ্যান পাওয়াও একপ্রকার কঠিন। বিভিন্ন সময়ে নানা মাধ্যমে বিভিন্ন রকম সংখ্যা প্রকাশ পেয়ে থাকে। আসলে সঠিক কোনটা, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এখানে আমি একটি উদাহরণ দিতে চাই, তাহলেই সারা দেশে এর ব্যাপকতা কী পরিমাণ অনুমান করা যাবে। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি অনলাইন নিউজপোর্টাল বাংলা ট্রিবিউন একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত আট কিলোমিটার রাস্তার আশপাশে গড়ে উঠেছে ৬৮টি মাদ্রাসা। এর মধ্যে ৬৬টি ব্যক্তিমালিকানাধীন কওমি মাদ্রাসা এবং ২টি সরকার অনুমোদিত আলিয়া মাদ্রাসা। এ ছাড়া, ওই আট কিলোমিটার মহাসড়কে ৪৭টি স্কুল-কলেজের খোঁজ পাওয়া গেছে। রাজধানীর চিত্রই যদি এমনটা হয় তাহলে সারা দেশে অনিয়ন্ত্রিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাটি কী আকার ধারণ করেছে, সেটি বুঝবার জন্য এই পরিসংখ্যানটিই যথেষ্ট।

বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে যুক্ত করে দেয়ার একটি নির্মম বাস্তবতাও আমরা দেখেছি। গ্রামের সাধারণ কোমলমতি মানুষের কাছে দুটো কুরআন-হাদিসের কথা বলে ভোট নিয়ে সংসদেও যেতে দেখেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করাও দেখেছি। যে দলের নেতারা ধর্মকে শুধু লেবাস হিসেবে ব্যবহার করে। এ জন্যই এ কথাটি বলছি, যদি তারা ধর্মকে মনেপ্রাণে ভালোবেসেই রাজনীতি করত, তাহলে তাদের সবার সন্তান মাদ্রাসা ছেড়ে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষা গ্রহণ করত না। অপরদিকে এই দলের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবার অতীত প্রশ্নবিদ্ধ। হত্যা, ধর্ষণ, রাহাজানি- এমন কোনো ন্যক্কারজনক কাজ নেই যা তারা করেনি। জীবনের একপর্যায়ে এসে ধর্মীয় লেবাস ধারণ করেছে। তবু শেষরক্ষা হয়নি। নিয়তির নির্মম পরিহাস পাপ তাদের ছাড়েনি। অপরাধের বিচারের শাস্তি হিসেবে বেশিভাগ শীর্ষ নেতার ফাঁসির দড়িতে ঝুলে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

আগেও বলেছি, আবারও বলতে চাই যে আমি মাদ্রাসাশিক্ষার বিপক্ষে নই। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে যে বিপুলসংখ্যক অপরিকল্পিত মাদ্রাসা প্রজন্ম গড়ে উঠছে, এর বিপক্ষে আমার অবস্থান। রাষ্ট্র পরিচালনা শিখতে যেমন আলাদা স্কুল প্রয়োজন হয় না, তেমনি ইসলাম শিখতেও আলাদা কোনো শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। বাস্তব জীবনে ধর্ম পালন এবং প্রাত্যহিক চর্চার মাধ্যমেই ইসলাম শেখা যায়- এই সরল সত্যটি উপলব্ধি করতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট, লেখক ও সাংবাদিক

ই-মেইল: [email protected]

সারাক্ষণ মতামতের বৈচিত্র্যে বিশ্বাস করে। এই লেখার বিষয়ে কারো যদি কোন ভিন্নমত থাকে তাহলে অনূর্ধ্ব ৪০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান আমাদের কাছে। সারাক্ষণ আপনার ভিন্নমত সাদরে গ্রহণ করবে। আপনার ভিন্নমত প্রকাশ হবে পাঠকের অভিমত কলামে। সঙ্গে আপনার নাম, সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাবেন, যা আপনার লেখার সঙ্গে প্রকাশ হবে। ভিন্নমত পাঠানোর ই-মেইল : ‍[email protected]
মতামত বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]
সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে মাতৃভাষা
পলি রানী মহন্ত

সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে মাতৃভাষা

বিএনপি অবশেষে ড্রামতত্ত্ব সামনে আনতে চাইছে
মুহম্মদ শফিকুর রহমান

বিএনপি অবশেষে ড্রামতত্ত্ব সামনে আনতে চাইছে

কতটা এগিয়েছে বাংলা ভাষা? 
শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন

কতটা এগিয়েছে বাংলা ভাষা? 

মেজর জিয়া ও মুক্তিযোদ্ধাদের মান-সম্মান
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

মেজর জিয়া ও মুক্তিযোদ্ধাদের মান-সম্মান