সব
শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭

হত্যার মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০:০০
হেফাজতে ইসলাম কথায় কথায় তথাকথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বা জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুললেই এরা আন্দোলনকারীদের ‘নাস্তিক’, ‘মুরতাদ’ ইত্যাদি নানা ধরনের ট্যাগ দেয়। এটা অবশ্য জামায়াতে ইসলামীরই পুরোনো কৌশল, হেফাজতের নেতারা অনুসরণ করে মাত্র

চলতি মাসেই বাংলাদেশের আদালত থেকে দুটো গুরুত্বপূর্ণ রায় আমরা পেয়েছি। জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে গত ১০ ফেব্রুয়ারি এবং এর ঠিক পাঁচ দিন পর ১৬ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। দুটো রায়ই ঘোষণা করেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান। দীপন হত্যা মামলার রায়ে আট আসামির সবাইকেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আট আসামি হলো সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়া, আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব ওরফে আবির ওরফে আদনান ওরফে আবদুল্লাহ, মইনুল হাসান শামীম ওরফে সামির ওরফে ইমরান, আবদুর সবুর সামাদ ওরফে সুজন ওরফে রাজু, খাইরুল ইসলাম ওরফে জামিল ওরফে জিসান, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন ওরফে শাহরিয়ার ও শেখ আবদুল্লাহ ওরফে জুবায়ের ওরফে জায়েদ ওরফে জাবেদ ওরফে আবু ওমায়ের। এই আসামিদের মধ্যে জিয়া ও আকরাম পলাতক। বাকিরা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে। এরা সবাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য। অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় পাঁচ জঙ্গিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং জঙ্গি ব্লগার শফিউর রহমান ফারাবীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ জঙ্গির মধ্যে চারজন (জিয়া, সায়মন ওরফে শাহরিয়ার, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব এবং আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব) দীপন হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।

দুটো রায়ের ক্ষেত্রেই আদালতের পর্যবেক্ষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। দীপন হত্যা মামলার ৫৩ পৃষ্ঠা রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক হত্যার উদ্দেশ্য উল্লেখ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, লেখক-ব্লগার-প্রকাশকদের হত্যার অংশ হিসেবে অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশের জন্যই জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়। পর্যবেক্ষণের আরেকটি অংশে বিচারক জানিয়েছেন, ‘যারা বই প্রকাশের দায়ে মানুষ হত্যা করতে পারে, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু।’

প্রায় একই ধরনের বক্তব্য আমরা পাই অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার পর্যবেক্ষণে। সেখানে হত্যার উদ্দেশ্য হিসেবে বিচারক মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করার কথা উল্লেখ করেছেন। পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মতপ্রকাশের জন্য অভিজিৎ রায়কে জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়।’ এই হত্যাকাণ্ডগুলোর মাধ্যমে হত্যাকারী উগ্র মৌলবাদীরা যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ ও নিরুৎসাহিত করার ষড়যন্ত্র করেছিল, সেটা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন আদালত।

২০১৩ সালের পর নির্মমভাবে এ দেশের মুক্তচিন্তক লেখক-ব্লগার ও প্রকাশকদের হত্যা করা হয়েছে। বিলম্বে হলেও এগুলোর বিচার হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্তদের মৃত্যুদণ্ডসহ নানা মেয়াদে সাজা হচ্ছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই হত্যাকাণ্ডের মদদদাতা বা প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্নভাবে যেসব নরপিশাচ এইসব হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গেয়েছে, তাদের এখনো বিচারের আওতায় আনা যায়নি। এমনকি এদের সম্পর্কে আদালতের পর্যবেক্ষণেও তেমন কোনো বক্তব্য নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এদের খুঁজে বের করার বিষয়ে তৎপর নয়। ফলে এখনো তারা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলোর সাফাই গেয়েই যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, আদালতের রায় নিয়েও তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও তামাশাপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছে।

এরই নজির পাওয়া যায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি উগ্র মৌলবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে। ‘অভিজিৎ হত্যার বিচারকে “তামাশা” বলেছে হেফাজত, দণ্ডিতদের মুক্তি চায়’ শিরোনামে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী বিবৃতি দিয়ে বলেছে ‘আমরা পূর্বে দেখেছি শাহবাগে উগ্র ইসলামবিদ্বেষী ফ্যাসিস্টদের একতরফা ‘ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই’ দাবি কতটা ন্যক্কারজনকভাবে বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছিল’ (সূত্র: সারাবাংলা ডটনেট, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১)।

অর্থাৎ কেবল মুক্তচিন্তকদের হত্যাকাণ্ডের সমর্থনই নয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে শাহবাগ আন্দোলনের ভূমিকা এবং আইনের মাধ্যমে রাজাকারদের শাস্তির বিষয়টিতেও তারা ক্ষুব্ধ। এ অবশ্য নতুন কোনো কথা নয়। যুদ্ধাপরাধীদের দোসর সংগঠন হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিতই হয়েছিল একাত্তরের রাজাকার আলবদরদের পিঠ বাঁচাতে। জামায়াতে ইসলামের অর্থে ও প্রচ্ছন্ন নেতৃত্বে লালিতপালিত হেফাজতে ইসলাম মাঠেই নেমেছিল শাহবাগ আন্দোলনকে প্রতিহত করতে। যদিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম তাতে বাধাগ্রস্ত হয়নি এবং এখনো এই বিচার প্রক্রিয়া চলছে; কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে হেফাজতে ইসলাম এখন জামায়াতে ইসলামীর জায়গা দখল করেছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির নিষিদ্ধ না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারছে না। কিন্তু তাদের উগ্রপন্থী রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন থেমে নেই। নিজেদের পকেট সংগঠন হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহার করে তারা বিভিন্নভাবে মৌলবাদী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ওই বিবৃতি তারই প্রমাণ।

হেফাজতে ইসলামের বিবৃতিটি পড়লেই বোঝা যায়, মুক্তচিন্তক হত্যা মামলাগুলোর রায়ে তাদের প্রতিক্রিয়া দেবার কারণটি কী। ব্লগার হত্যাকাণ্ডগুলো খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়। যে সময়ে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুব সরব ভূমিকা পালন করেছে। এখনো খুঁজে দেখলে হেফাজতে ইসলামের বহু নেতা আর সমর্থকদের ফেসবুক পোস্ট পাওয়া যাবে, যেখানে তারা হত্যাকাণ্ডকে উসকে দেয়ার মতো নানা ধরনের হিংসাত্মক বক্তব্য দিয়েছে। ধর্মের জিকির তুলে মানুষ হত্যার ন্যক্কারজনক রাজনীতি করেছে। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে উগ্রপন্থী শফিউর রহমান ফারাবীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে এই হত্যাকাণ্ডকে উসকে দেয়ার কারণেই। ফারাবীর তৎকালীন ফেসবুক পোস্টগুলোর কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। অভিজিৎ রায়কে হত্যার নানা মাত্রিক পরিকল্পনাতে সে জড়িত ছিল। ২০১৩ সালে রাজীব হায়দার বা ২০১৫ সালে অভিজিৎ রায়সহ অন্য ব্লগারদের হত্যার পর ভাড়াখাটা সংগঠন হেফাজতে ইসলামের অনেক নেতা-কর্মীই এইসব হত্যাকাণ্ডের পক্ষে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছে। একটি হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার পর তারা এমন সব বক্তব্য দিয়েছে, যেগুলো পরবর্তী আরেকটি হত্যাকাণ্ডকে প্ররোচিত করেছে। এগুলো অনুসন্ধান করে বের করাটা খুব কঠিন নয়; কেবল আইনশৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনীর সদিচ্ছাই যথেষ্ট।

হেফাজতে ইসলাম কথায় কথায় তথাকথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বা জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুললেই এরা আন্দোলনকারীদের ‘নাস্তিক’, ‘মুরতাদ’ ইত্যাদি নানা ধরনের ট্যাগ দেয়। এটা অবশ্য জামায়াতে ইসলামীরই পুরোনো কৌশল, হেফাজতের নেতারা অনুসরণ করে মাত্র। অথচ এই অপোগণ্ড সংগঠনের নেতারা কীভাবে অর্থের কাছে বেচা-বিক্রি হয়, কীভাবে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জেরে নিজেদের সংগঠনের নেতাকেই হত্যা করে— তা এই কিছুদিন আগেও আমরা দেখতে পেয়েছি। খোদ হেফাজতে ইসলামের নেতারাই আরেক অংশের বিরুদ্ধে শাহ আহমদ শফীকে হত্যার অভিযোগে মামলা করেছে। কিছুদিন আগে তাদের ফেসবুক পোস্টগুলো থেকেই আমরা জেনেছি, কীভাবে কত টাকার বিনিময়ে, কতখানি সরকারি জমির বিনিময়ে এরা পকেট বদল করে। তারা হত্যাকে সমর্থন করবে, হত্যাকারীর বিচারকে ‘তামাশা’ বলবে— এ আর নতুন কি!

হেফাজতে ইসলামের বিবৃতির মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়েছে পুরোনো সত্যটি— এরা মূলত যুদ্ধাপরাধীদের দোসর হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছে। যখন মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের ওপরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ যৌন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল দেশের মানুষ, আইন সংশোধন করে এই নিপীড়কদের ধর্ষণ মামলার আওতায় আনার আলোচনা হচ্ছিল, তখনই এইসব উগ্রপন্থী বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সম্পর্কে কটূক্তি শুরু করে। লাখ লাখ মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে রাজনীতি করে আদতে এরা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টাই করে যাচ্ছে।

আইন তার নিজের শক্তিতে চলতে পারলে আর রাজনীতি আদর্শঘনিষ্ঠ হলে এইসব অপশক্তি কখনোই মাথায় চড়ে বসতে পারত না।

লেখক : লেখক ও ব্লগার

সারাক্ষণ মতামতের বৈচিত্র্যে বিশ্বাস করে। এই লেখার বিষয়ে কারো যদি কোন ভিন্নমত থাকে তাহলে অনূর্ধ্ব ৪০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান আমাদের কাছে। সারাক্ষণ আপনার ভিন্নমত সাদরে গ্রহণ করবে। আপনার ভিন্নমত প্রকাশ হবে পাঠকের অভিমত কলামে। সঙ্গে আপনার নাম, সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাবেন, যা আপনার লেখার সঙ্গে প্রকাশ হবে। ভিন্নমত পাঠানোর ই-মেইল : ‍[email protected]
মতামত বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]
চীন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

চীন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

টিকার ব্যবস্থাপনা থেকে কি আমরা কিছু শিখব?
প্রভাষ আমিন

টিকার ব্যবস্থাপনা থেকে কি আমরা কিছু শিখব?

সশস্ত্র জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

সশস্ত্র জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা