সব
শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭
AD

আমি বেগমবাজারের মেয়ে-২১

কী মধুর বাংলা ভাষা

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫:০০
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ছিলেন। তিনি ১৮টি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন (এই ভাষাগুলোতে তিনি রীতিমতো পণ্ডিত ছিলেন), ২৭টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন (তার মানে ২৭টি ভাষায় কথা বলতে, পড়তে, লিখতে জানতেন) এবং ৪০টি ভাষা সম্পর্কে তার পড়াশোনা ছিল। তিনি সংস্কৃত, প্রাচীন পাহ্লবী, আরবি, হিব্রু, খোতনি, তিব্বতি, পালি ইত্যাদি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি এবং চর্যাপদ নিয়ে মূল গবেষণা করেছিলেন।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’- কী মধুর সংগীত। কী স্মৃতিময় সুর। এই সুর আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সত্তর ও আশির দশকে। ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফাল্গুনের ভোরবেলায়। ফিরিয়ে নিয়ে যায় হালকা হিমমাখা প্রভাতফেরির নরম আলোর ভুবনে।

সত্তর ও আশির দশকের প্রথম দিকে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে সবাই যেত প্রভাতফেরিতে। তার মানে খুব ভোরবেলায়। সূর্য ওঠার প্রথম প্রহরে। তখন কিন্তু রাত ১২টায় শহীদ মিনারে যাওয়ার রীতি ছিল না। আমার মনে পড়ে না, ঠিক কখন বা কবে থেকে শহীদ মিনারে রাতে যাওয়ার রীতি হলো। বোধ হয় এরশাদ আমলে এর প্রচলন শুরু হয়। আমি শৈশবে বাবার সঙ্গে অনেকবার প্রভাতফেরিতে গিয়েছি। পরে নব্বইয়ের দশকে গিয়েছি সকাল ৮টা-৯টার দিকে। শহীদ মিনারে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাবার উৎসাহ ছিল খুব বেশি। ভাষা আন্দোলনের প্রতি তিনি ছিলেন খুব আবেগপ্রবণ। এর কারণ ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। আমার দাদা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান উদগাতা। সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের অনেক আগে থেকেই তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলা ভাষার দাবি তুলে ধরতে থাকেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর প্রস্তাব দিলে তার তীব্র প্রতিবাদ করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এখানে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বিষয়ে একটু পরিচয় দিতে চাই। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম অনেক সময় জানেই না কে ছিলেন তিনি, আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে কী ছিল তার ভূমিকা।

কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ ও মুর্তজা বশীর

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ছিলেন। তিনি ১৮টি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন (এই ভাষাগুলোতে তিনি রীতিমতো পণ্ডিত ছিলেন), ২৭টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন (তার মানে ২৭টি ভাষায় কথা বলতে, পড়তে, লিখতে জানতেন) এবং ৪০টি ভাষা সম্পর্কে তার পড়াশোনা ছিল। তিনি সংস্কৃত, প্রাচীন পাহ্লবী, আরবি, হিব্রু, খোতনি, তিব্বতি, পালি ইত্যাদি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি এবং চর্যাপদ নিয়ে মূল গবেষণা করেছিলেন। তার মতে, বাংলা ভাষার উৎপত্তি হলো গৌড়ীয় বা মাগধী প্রাকৃত থেকে। বাংলা ভাষা সংস্কৃতের কন্যা নয়, তবে নিকটাত্মীয়। তিনি মনে করতেন, বাংলা ভাষার উৎপত্তিকাল সপ্তম শতাব্দী। তার পাণ্ডিত্যের মূল বিষয় ছিল তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব। আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত ইত্যাদি তার অমর অবদান। তিনি উর্দু অভিধানও প্রণয়ন করেছেন এবং শ্রীলঙ্কার ভাষার উৎপত্তিও নির্ধারণ করেছেন।

আমি ছোটবেলায় মনে করতাম ডক্টর শব্দটি বোধ হয় দাদার নামেরই অংশ। সত্যি সত্যি মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নামের সঙ্গে ডক্টর শব্দটি যেন জুড়ে গেছে। ঠিক একইভাবে তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। তিনি ১৮টি ভাষায় সুপণ্ডিত হলেও গভীরভাবে ভালোবাসতেন বাংলা ভাষাকে। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই ছিলেন সোচ্চার। তিনি ১৯৪৭ সাল থেকেই এ বিষয়ে তীব্র দাবি উত্থাপন করছিলেন বিভিন্ন প্রবন্ধে ও ভাষণে। তিনি বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হয়ে উর্দু বা আরবি হলে তা হবে গণহত্যার শামিল। তিনি পাকিস্তান সরকারের সকল প্রকার ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে বাংলা ভাষার পক্ষে তার সংগ্রাম চালিয়ে যান। তিনি ভাষা আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের জন্য ছিলেন প্রধান প্রেরণা। একুশে ফেব্রুয়ারি হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রথম কালো ব্যাজ ধারণ করেন।

তার দুই পুত্র মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ (আমার বাবা) ও মুর্তজা বশীর দুজনেই ভাষাসৈনিক ছিলেন। কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ ছিলেন ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও কর্মী। আর মুর্তজা বশীর ছিলেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের (তকীয়ূল্লাহ তখন জেলখানায় রাজবন্দী ছিলেন) অন্যতম প্রধান কর্মী।

আমার বাবা ভাষা আন্দোলনের প্রথম আলোকচিত্রীও। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ যে ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের বিক্ষোভ ও আন্দোলন, সেই বিক্ষোভ মিছিলের মাত্র চারটি আলোকচিত্র পাওয়া যায়। এই চারটি ছবি আমার বাবার তোলা। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে তিনি ছিলেন ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগঠক। ১১ মার্চ গ্রেপ্তার হওয়া ভাষাসৈনিকদেরও তিনি অন্যতম।

১৯৫২ সালে তিনি জেলে বন্দী ছিলেন। সে সময় জেলে থেকেই রাজবন্দীরা একুশে ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের বিষয়ে প্রথম নাটক মুনীর চৌধুরীর লেখা ‘কবর’। নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয় জেলখানায়। সেই নাটকেও অন্যতম অভিনেতা ছিলেন বাবা।

আমি ছোটবেলা থেকেই বাবার মুখে শুনে এসেছি শহীদুল্লাহর সেই অমরবাণী: ‘মা, মাতৃভাষা, মাতৃভূমি প্রত্যেক মানুষের পরম শ্রদ্ধার বস্তু’। বাংলা ভাষার এই একনিষ্ঠ সেবক ও বাংলামায়ের কৃতী সন্তানের বিষয়ে না জানলে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অনেকটাই অজানা রয়ে যায়।

একুশের প্রভাতফেরিতে ১৯৭৬৪

যা হোক যা বলছিলাম, শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ফেরার পথে আমরা (আমি ও বাবা) সব সময় দাদার কবর জিয়ারত করতাম। মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবর রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল প্রাঙ্গণে। সেটি আশির দশকের কথা। কবরটি সে সময় দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। বাবা প্রথম সেটির কিছুটা সংস্কার করে সেখানে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বিষয়ে একটি সাইনবোর্ড দেয়ার ব্যবস্থা করেন নিজস্ব অর্থায়নে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্থানটির অনেক সংস্কার করেছে।

বাংলাএকাডেমির একুশের কবিতাপাঠে লেখক ১৯৭৯

আমার মনে পড়ে, হাইকোর্টের সামনে থেকেই তখন খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে যাওয়ার নিয়ম ছিল। মা ও ভাইয়া অত সকালে অত দূর হাঁটতে উৎসাহী ছিলেন না। আমি বাবার সঙ্গে ভোর ৫টায় উঠে রওনা হতাম। বাবা আমাকে অনেকটা পথ কোলে নিয়ে যেতেন। বাকি পথটা মোজা পরিয়ে দিতেন। তাতে খালি পায়েও হাঁটা হলো আবার ধুলো লাগারও তেমন ভয় রইল না।

ভাষাআন্দোলন ১৯৪৮

১৯৭৯ বা ৮০ সালে আমরা শহীদ মিনার থেকে দাদার কবর জিয়ারত শেষে সোজা চলে গেলাম বাংলা একাডেমিতে। সেবার একুশের সকালে বাংলা একাডেমির কবিতা পাঠের আসরে আমি নিজের লেখা ছোট্ট একটি কবিতা পড়ি। বাবা এটার ব্যবস্থা করেছিলেন সম্ভবত রশীদ হায়দার চাচাকে বলে। সেটিই আমার জীবনে প্রথম একুশের ভোরে বাংলা একাডেমিতে কবিতা পাঠ। সেই আসরে কবি আসাদ চৌধুরী চাচা এবং কবি রফিক আজাদ চাচার কথা আমার মনে আছে।

ভাষাসৈনিক হিসেবে সম্মাননা গ্রহণ করছেন কমরেড তকীয়ূল্লাহ

আমাদের মহল্লা মানে আলুবাজার মহল্লার ছেলেরা প্রতিবছর প্রভাতফেরিতে যেত। অগ্রণী সংসদ নামে একটি ক্লাবের পক্ষ থেকে পাড়ার তরুণ ছেলেরা একুশের প্রভাতফেরিতে ফুল নিয়ে যেত শ্রদ্ধা জানাতে। তারা প্রায় সারা রাত জেগে তৈরি করত ব্যানার ও ফুলের স্তবক। ওদের সঙ্গেও কয়েকবার গিয়েছি বাবা ও আমি। ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই হিম হিম অন্ধকারে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গান গাইতে গাইতে শহীদ মিনারে যাওয়ার স্মৃতি আমার জীবনে অবিস্মরণীয়। বাতাসে ভেসে বেড়ানো লাখো মানুষের কণ্ঠে গানের সুর আর ফুলের সৌরভ এক হয়ে আছে আমার শৈশব স্মৃতির সঙ্গে।

শিল্প ও সাহিত্য বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]
AD

সাম্প্রতিক

সবকিছু আইসিসির ওপর ছেড়ে দিয়েছেন রুট

সবকিছু আইসিসির ওপর ছেড়ে দিয়েছেন রুট

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার মুসতাকের কারাগারে মৃত্যু

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার মুসতাকের কারাগারে মৃত্যু

ফ্যানের ইতিহাস

ফ্যানের ইতিহাস

একটি বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম তৈরির চেষ্টা

একটি বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম তৈরির চেষ্টা

পোশাকে প্রকৃতি...

পোশাকে প্রকৃতি...

চিকেন মিনস লোফ

চিকেন মিনস লোফ

অর্ধেক নারী-পুরুষ কার্ডিনাল পাখি!

অর্ধেক নারী-পুরুষ কার্ডিনাল পাখি!

সাউথ পাদ্রে আইল্যান্ড: ছয়

সাউথ পাদ্রে আইল্যান্ড: ছয়

সাউথ পাদ্রে আইল্যান্ড: পাঁচ

সাউথ পাদ্রে আইল্যান্ড: পাঁচ

ঢাকাইয়া স্বাদের তুলনা নেই

ঢাকাইয়া স্বাদের তুলনা নেই