সব
বুধবার, ০৩ মার্চ ২০২১, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭
AD

গর্বের অপর নাম একুশ

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০১
একুশে ফেব্রুয়ারি আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী জনগণের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। এটি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আজ বিশ্বময় পরিচিতি পেয়েছে। বাঙালি জনগণের ভাষা আন্দোলনের মর্মন্তুদ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

পৃথিবীতে মায়ের মুখের ভাষার অধিকারের জন্য রক্তদানের আর কোনো ইতিহাস নেই। তাবৎ দুনিয়ায় বিরলতম এই কীর্তির রেকর্ড শুধু বাঙালিরই। এ দেশের নরম পলিমাটির বুকে বেড়ে ওঠা তরুণ-যুবারা যে একেকজন ন্যায্য দাবি আদায়ের ইস্পাত কঠিন যোদ্ধা, তার প্রথম স্বাক্ষর এই অমর একুশে ভাষার আন্দোলন। যে আন্দোলনের মন্ত্র শেষতক আমাদের স্বাধীন একটি ভূমি এনে দিয়েছে। পথ দেখিয়েছে জাতির আরো নানা কঠিন সময়ে। তাই মাতৃভাষার আন্দোলনটি স্বাধীনতাযুদ্ধের চেয়েও বেশি গুরুত্ববাহী। ভাষা আন্দোলন যদি হয় বটবৃক্ষের বীজ, স্বাধীনতা আন্দোলন হলো তার পূর্ণরূপ বৃক্ষ। অমর একুশে তাই আমাদের গর্বের আরেক নাম।

ভাষার দাবিতে এই আন্দোলন ছিল আমাদের বোধবুদ্ধি ও চেতনার আন্দোলনও। এই চেতনা একুশে ফেব্রুয়ারি-পরবর্তী সময়েও আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ভূমিকা রেখেছে, পথ দেখিয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনার মোড় পরিবর্তনের সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল এবং আছে। এই ‘একুশ’ মানুষকে স্বৈরাচার এবং গণবিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহসী করেছে। একুশের শহীদ মিনারে শপথ নিয়েই এ দেশের মানুষ পথ চলেছে প্রতিটি সংগ্রামে। বাংলাদেশের সাহিত্য, নাটক, সংগীতসহ চিত্রকলা ও সংস্কৃতির সব মাধ্যমে একুশ যতখানি প্রভাব ফেলেছে, অন্য কোনো আন্দোলন বা সংগ্রাম ততখানি প্রভাব ফেলতে পারেনি। একুশের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক থাকার কারণেই সেটি সম্ভব হয়েছে।

প্রকৃতিতে যখন রাঙা পলাশ-শিমুলের বসন্তের আবাহন ঘটে, প্রায় সাত দশক আগের এ রকম একটি দিনেই ভাষার আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। অগ্নিঝরা ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল শহর থেকে গ্রামে। সে এক নজিরবিহীন গণ-আন্দোলন। আরবির মতো দেখতে যে উর্দু ভাষা, সেটির প্রতি তখনকার সমাজের অনেকে দুর্বল ছিল। সেই স্পর্শকাতর অবস্থার মধ্যে  তখনকার সচেতন তরুণ-যুবারা যে গণ-আন্দোলনটা করেছিল, তা ছিল বড় এক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তরুণ-যুবারা পিছপা হয়নি। তারা বুঝতে পেরেছিল, পাকিস্তানি শাসকরা তাদের শোষণ অব্যাহত রাখতে দেশের অস্তিত্বের মূল সংস্কৃতিকে সমূলে উৎপাটন করতে চায়। এবং করার চেষ্টাও করেছিল তারা। এ কারণে তারা প্রথমেই আঘাত করেছিল আমাদের অস্তিত্বের মূল ভাষার ওপর। কারণ, ভাষার ওপর ভর করেই একটি দেশের সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে থাকে। এই সংস্কৃতিই একটি দেশের প্রাণ। নিজ সংস্কৃতি ছাড়া একটি জনগোষ্ঠী হস্ত-পদ-স্কন্ধ ছাড়া একটি দেহ বৈ কিছু নয়। আর এ কারণেই পাকিস্তানি শাসকেরা প্রথমে লক্ষ্য করেছিল আমাদের ভাষাকে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সেটি ঠেকিয়ে দিয়েছিল আমাদের দামাল ছেলেরা।

একুশে ফেব্রুয়ারি আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী জনগণের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। এটি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আজ বিশ্বময় পরিচিতি পেয়েছে। বাঙালি জনগণের ভাষা আন্দোলনের মর্মন্তুদ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অথচ সেই ৫২-তে আন্দোলনকারীরা ভবিষ্যৎ অনুমান করতে পেরেছিলেন। কতটা ‍দূরদর্শী ছিল তাদের সেই চিন্তাভাবনা, যা এখন ভাবতে বসলে বিস্মিত হতে হয় আমাদের।  

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির দিনটি ছিল বাংলায় ৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮ সন। শিমুল-পলাশ ফোটা সেই দিনটিতে মাতৃভাষার আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে। কারণ, পাকিস্তানি শাসকরা উর্দুকে যে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিল, তারই বিরুদ্ধে আন্দোলনে ফেটে পড়ে তখন ছাত্ররা। ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করে পাকিস্তানি শাসকের পেটোয়া বাহিনী। শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরো অনেকে। শহীদের রক্ত কোনোকালেই যে বৃথা যায় না, ভাষাশহীদদের সেই বিশ্বাস ছিল। সেই বিশ্বাসের জয় হয়েছে পরে। ২০১০ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়।

ভাষা আন্দোলনের মহান সংগ্রামের শিক্ষা হচ্ছে, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। বছর ঘুরে ফেব্রুয়ারি আসে, আর ফেব্রুয়ারির সিঁড়ি বেয়ে আসে একুশ। সময়ের আবর্তনে এবারো ফেব্রুয়ারি এসেছে এবং এসেছে অমর একুশে। আমাদের গর্ব ‘অমর একুশে’ এবার পূর্ণ করবে ৬৯ বছর। রক্তরঞ্জিত একুশে এখন শুধু বাঙালির নয়, গোটা বিশ্ববাসীর সম্পদ, ঐতিহ্য ও গর্বের উৎস। একুশে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি লাভ করেছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। ১৯৫২-র এই ভাষা আন্দোলন ছিল নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুকঠিন লড়াই।

তৎকালে বঙ্গীয় সমাজে বাংলা ভাষার অবস্থান নিয়ে বাঙালির আত্ম-অন্বেষায় যে ভাষাচেতনার উন্মেষ ঘটে, তারই সূত্র ধরে দেশ বিভাগোত্তর পূর্ব বঙ্গের রাজধানী ঢাকায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তার চরম প্রকাশ ঘটে। ভাষা আন্দোলনের এই হলো সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। অথচ এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের মধ্যেই বাঙালির হাজার বছরের মহাকাব্য লেখা হয়ে গেছে। যে ইতিহাসের গৌরবযাত্রা কোনো দিনই শেষ হবে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা আরো দেখতে পাই আজকের লাল-সবুজের গৌরবের জাতীয় পতাকা যে মুক্ত আকাশে পতপত করে উড়ছে, যার তলে আমরা সুশীতল আশ্রয় খুঁজি, সেই পতাকা লাভের প্রথম পদক্ষেপ ছিল আমাদের ভাষার আন্দোলন। আমরা যদি সংক্ষেপেও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসটায় চোখ বুলাই, দেখব বাঙালির আত্মগৌরব প্রতিষ্ঠার এক স্বর্ণালি অধ্যায়। যে গৌরব গাথা আমাদের হাজার বছর ধরে মাথা উঁচু করে রাখার শক্তি দেবে।

লেখক: কলামিস্ট। সম্পাদক, দ্য রিপোর্ট

শিল্প ও সাহিত্য বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]
AD

সাম্প্রতিক

অনুরাগ-তাপসীর বাড়িতে আয়কর হানা   

অনুরাগ-তাপসীর বাড়িতে আয়কর হানা   

চট্টগ্রামে আগাম ঘোষণা না দিয়েই বন্ধ পদ্মা ওয়্যারস লিমিটেড

চট্টগ্রামে আগাম ঘোষণা না দিয়েই বন্ধ পদ্মা ওয়্যারস লিমিটেড

ম্যাক্সওয়েলের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ২০৮

ম্যাক্সওয়েলের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ২০৮

ভুয়া এনআইডি কার্ড দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করত চক্রটি

ভুয়া এনআইডি কার্ড দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করত চক্রটি

রাজশাহীতে কৃষকদের মানববন্ধন

রাজশাহীতে কৃষকদের মানববন্ধন

পরীক্ষার দাবিতে ডুয়েট শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

পরীক্ষার দাবিতে ডুয়েট শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

মেয়েকে দিয়ে যৌন ব্যবসা করানোর দায়ে মা কারাগারে

মেয়েকে দিয়ে যৌন ব্যবসা করানোর দায়ে মা কারাগারে

কোভ্যাক্সের টিকা আসছে মার্চের মধ্যে: স্বাস্থ্যসচিব

কোভ্যাক্সের টিকা আসছে মার্চের মধ্যে: স্বাস্থ্যসচিব

দেশপ্রেম এবং সাহিত্যের দায়

দেশপ্রেম এবং সাহিত্যের দায়

রাষ্ট্রে ধর্ম মুখ্য হলে একুশের চেতনা থাকে না

রাষ্ট্রে ধর্ম মুখ্য হলে একুশের চেতনা থাকে না

নাটকে মাতৃভাষার বৈচিত্র্যময় উপস্থাপন

নাটকে মাতৃভাষার বৈচিত্র্যময় উপস্থাপন

ভাষা আন্দোলনের অগ্নিকন্যা মমতাজ বেগম

ভাষা আন্দোলনের অগ্নিকন্যা মমতাজ বেগম