সব
বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২ ফাল্গুন ১৪২৭

লোভের বেহায়াপনা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০১
এখন আমাদের বাড়ি বাড়ি উড়ছে লাম্পট্যের নিশান । আগে কেউ লাখপতি হলে নিশান উড়াত বাড়িতে । এখন চোখ বুজলেই হাজার কোটি। করোনার মন্দাকালেও কোটিপতির ভালো ফলন হয়েছে । মন্ত্র ফুরোনোর আগেই টাকা উড়ে যায় দ্বিতীয় স্বদেশে । আসলে এদের কোনো স্বদেশ নেই

আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন বাবা-মায়েরা বা বড়রা অনেক কথাই আমাদের সামনে বলতেন না। ফিসফিস করে বলতেন । আমরা ভাবতাম, কী জানি কী লংকাকাণ্ড ঘটে গেছে চারদিকে। কৌতূহল বাড়ত কানপাতার। কখনো কখনো দু-একটি শব্দ কানে আসত। প্রতিবেশী বা নিকটাত্মীয়, পরিচিতদের কেউ হঠাৎ অনেক টাকাপয়সার মালিক হয়ে গেল। কীভাবে হলো? বড়লোক হওয়ার পথচিত্র কেমন ছিল, তা নিয়ে সবার উৎসুক মন। এই হঠাৎ বড়লোক হওয়া মানুষদের সঙ্গে, সকলে তখন মিলে যেতে পারতেন না। শক্ত বাঁধ ছিল । সেই বাঁধ লোভের স্রোতের পক্ষে উপচে যাওয়া সম্ভব ছিল না । ফলে ওই মানুষগুলোর একপ্রকার বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতো পরিবার, সমাজের সঙ্গে। বিচ্ছিন্ন ওই মানুষগুলো মিলে আবার জোট বাঁধত। শুধু যে নিজেদের একাকিত্ব তৈরির জন্য, এমন নয় । লক্ষ্য ছিল লোভের দানব হওয়ার। এই দানবদের সঙ্গে বাঁধ চুয়ে কিছু মানুষ ঠিকই মিশে যেত । তাদেরও লোভের অংশীদার হওয়ার বাসনা ছিল । দানব-বন্দনা করত লুকিয়ে-চুরিয়ে। ধীরে ধীরে সেটা প্রকাশ্য রূপ নেয় । লজ্জা, ভয় কাটিয়ে বেহায়াপনার এক সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি আমরা । তাই গেলাম শেষ পর্যন্ত ।

আমাদের স্কুল বেলায় মহল্লায় যে বাড়িতে রঙিন টিভি আসত, শীতাতপযন্ত্র লাগত, আমরা উৎসুক হতাম তাদের আয়-রোজগার জানতে। বিদেশফেরত বা বিদেশে আছেন, এমন পরিবার নিয়ে সংশয় ছিল না । কিন্তু কোনো কোনো পরিবারের আয় ঠাওর করতে পারতাম না । এখনো পারি না। শুরুর দিকে ঠিকাদার শ্রেণির উত্থান দিয়ে পুঁজির আস্ফালন শুরু হয়। ধীরে ধীরে বিভিন্ন পেশাজীবীরা এই আস্ফালনের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে নব্বইয়ের দশকে, যেখানে হোন্ডা সিভিক দেখে কপালে চোখ তুলতাম, কীভাবে কেনা হলো এমন গাড়ি? পাজেরো মানে ইউটোপিয়ার মানুষের বাহন । সেই আমরাই এখন ট্রাফিক সিগন্যালে ঘেমে যাই চারদিকের জাগুয়ার, ওডি, মার্সেডিজ, বিএমডব্লিউ, ল্যান্ডরোভারের ভিড় দেখে। আমাদের সন্তানরা বায়না ধরে অমন গাড়ি তিন-চার লাখের বাইক কিনে দিতে । আমরা আশ্বস্তও করি, কিনে দেবার।

ওদের আবদার পূরণের ছুতোয় নিজেদের লোভ মেটাতে আমরা নেমে গেলাম প্রতিযোগিতায়। কে কার চেয়ে বেশি ভোগের সাম্রাজ্য গড়তে পারি, লিপ্সা বাড়াতে থাকি সন্তানদেরও। ওদের মনে কোনো সংশয় নেই, আমাদের মনে কোনো লাজ নেই । কোথা থেকে টাকা এল, এ নিয়ে সন্তানরা ভাবছে না । কতটা বাড়ছে তা নিয়েই উদ্বেগ। ধীরে কেন, আরো দ্রুত আসছে না কেন? সন্তানরা কোন নর্দমায় টাকা ঢেলে দিচ্ছে, তা নিয়ে কোনো জবাবদিহি নেই। নির্লজ্জের মতো থাবা দিয়ে টাকা আনছি । এখন আত্মীয়-পরিজনের বাম্পার বিত্ত নিয়ে সংশয় নেই । তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার তাগিদ নেই । কবেই তো ভেঙেছি নৈতিকতার বাঁধ ।

এখন আমাদের বাড়ি বাড়ি উড়ছে লাম্পট্যের নিশান । আগে কেউ লাখপতি হলে নিশান উড়াত বাড়িতে । এখন চোখ বুজলেই হাজার কোটি। করোনার মন্দাকালেও কোটিপতির ভালো ফলন হয়েছে । মন্ত্র ফুরোনোর আগেই টাকা উড়ে যায় দ্বিতীয় স্বদেশে । আসলে এদের কোনো স্বদেশ নেই । লোভের কবরে লম্ফঝম্ফ এদের । আশ্চর্য বিষয় হলো, দানবদের অবনমন, পতন এবং নিঃস্ব হয়ে অসহায় চলে যাওয়া দেখেও আমরা বিমর্ষ হচ্ছি না । হাঁটতে শুরু করছি না সংযমের পথে। উল্টো যেন খিদে চাউর দিয়ে উঠছে। চাই চাই আরো চাই । আমাদের এই চাইয়ের সড়কেই মৃত্যু ঘটবে । ঘটতে শুরু করেছেও । নৈতিকতা , শিক্ষা, সংস্কৃতির মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে । তবু বিকার নেই আমাদের। আমরা অস্থিরতায় দৌড়াচ্ছি। শরীর নিথর হয়ে পড়ার আগে হয়তো আমাদের এই বেহায়াপনার শেষ হবে না ।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

সারাক্ষণ মতামতের বৈচিত্র্যে বিশ্বাস করে। এই লেখার বিষয়ে কারো যদি কোন ভিন্নমত থাকে তাহলে অনূর্ধ্ব ৪০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান আমাদের কাছে। সারাক্ষণ আপনার ভিন্নমত সাদরে গ্রহণ করবে। আপনার ভিন্নমত প্রকাশ হবে পাঠকের অভিমত কলামে। সঙ্গে আপনার নাম, সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাবেন, যা আপনার লেখার সঙ্গে প্রকাশ হবে। ভিন্নমত পাঠানোর ই-মেইল : ‍[email protected]
মতামত বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]
টিকার ব্যবস্থাপনা থেকে কি আমরা কিছু শিখব?
প্রভাষ আমিন

টিকার ব্যবস্থাপনা থেকে কি আমরা কিছু শিখব?

সশস্ত্র জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

সশস্ত্র জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা

ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং আমাদের সামাজিক অবস্থা
সাজ্জাদ কাদির

ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং আমাদের সামাজিক অবস্থা

হত্যার মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক
মারুফ রসূল

হত্যার মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক