সব
বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২ ফাল্গুন ১৪২৭
 

পাহাড়ের ওই দেশে যাই...

তলাংময়, স্বপ্নচূড়া। নাম যাই হোক এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উচ্চতা ৩,৪৫১ ফুট। সেখানে গিয়েছিলাম ২০১৫ সালে। এ চূড়ার প্রথম আরোহী ব্রিটিশ পর্বতারোহী জিঙ ফুলেন। ২০০৫ সালে আরোহণ করেন তিনি। তারপর অনেক অভিযাত্রীই গেছেন এখানে।

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০১

ট্রেকিং হাইকিংয়ের আকর্ষণ চিরকালীন। শহুরে নাগরিকতা থেকে ছুটি নিয়ে পর্বত অরণ্যের বিশালতায় হারিয়ে যাওয়ার টানে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছুটে যায় মানুষ। বয়সের ব্যবধান এখানে গৌণ। যুবা থেকে বৃদ্ধ, ট্রেকিং হাইকিং টানে সবাইকে। রিয়াসাদ সানভীর সঙ্গে ঘুরে আসা যাক দেশের চার পাহাড়চূড়ার পথে।

 

সর্বোচ্চ চূড়ার সন্ধানে...

তলাংময়, স্বপ্নচূড়া। নাম যাই হোক এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উচ্চতা ৩,৪৫১ ফুট। সেখানে গিয়েছিলাম ২০১৫ সালে। এ চূড়ার প্রথম আরোহী ব্রিটিশ পর্বতারোহী জিঙ ফুলেন। ২০০৫ সালে আরোহণ করেন তিনি। তারপর অনেক অভিযাত্রীই গেছেন এখানে। অবশ্য বলেকয়ে কেওক্রাডংয়ে যেমন অনেকেই চলে যান, তলাংময়ে যাওয়া কিন্তু এতটা সোজা না। আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল বান্দরবানের রুমা উপজেলা থেকে। অবশ্য থানচি হয়ে যাওয়া তুলনামূলক সহজ। সেবার ঈদযাত্রায় মানুষের ঢল নেমেছে। সেই সঙ্গে মহাসড়কে যানজট। বান্দরবানে যেখানে পৌঁছানোর কথা সকাল ৮টার মধ্যে, সেখানে ১১টা বাজল। রুমার বাস ধরতে ধরতে ১২টা। তাও সরাসরি রুমা যাওয়া গেল না। সদরঘাট থেকে প্রথমবারের মতো নৌকায় রুমা গেলাম। ঘাটে তৌহিদ আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। বেচারা বোধ হয় বড় দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে, আমি আসব। কেউ একা একা তলাংময় যেতে পারে, এটি তাকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। সেই দিনই আমরা চলে গেলাম বগা লেক। সকালে ঘুম থেকে উঠেই পা চালাতে হলো ইঞ্জিনের গতিতে। দার্জিলিংপাড়ায় পৌঁছে শরীর গরম করার জন্য খানিক চা পানের বিরতি। প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই আমরা কেওক্রাডং পার হয়ে চলে এলাম থাইকিয়াং পাড়ার কাছাকাছি। সেখানে এসে রেমাক্রী খালের প্রবল গর্জন দেখে তাম্লোপাড়ার পথ ধরলাম। আজকে রাত কাটাব পুরোনো তাম্লোপাড়ায়। কাল ঈদুল আজহা। ঈদের দিন হলো স্বপ্ন পূরণ। বাংলাদেশের স্বপ্নচূড়ায় আমি। পুরোনো তাম্লোপাড়া থেকে রওনা হয়ে থান্দুই পাড়া, নয়াচরণ, হাজরাপাড়া, নেফিউপাড়া হয়ে সামিট করলাম দেশের সর্বোচ্চ চূড়া। ত্লাংময় যাওয়ার অনেকগুলো রুট আছে। মূলত রুমা এবং থানচি উপজেলা হয়ে আসতে হবে এখানে। সবচেয়ে সহজ থানচি হয়ে আসা। থানচিতে প্রচুর ট্রেকিং গাইড আছে। তবে এ রুটে ট্রেকিং করা একটু খরুচে ব্যাপার। এ ছাড়া নিরাপত্তার কিছুটা সমস্যা আছে। তাই ভালোভাবে খোঁজখবর করেই আসতে হবে ত্লাংময়ের পথে।

তাজিনডং....

বইপত্রে এখনো তাজিনডং বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে এ চূড়ার উচ্চতা ২,৭০০ ফুটের বেশি নয়। তাজিনডংয়ে আসার পথ কিন্তু এতটা সহজ না। এটি পড়েছে থানচি উপজেলায়। আমরা কেওক্রাডং হয়ে ট্রেকিং করে গিয়েছিলাম তাজিনডং পাহাড় চূড়ায়। রুমা থেকে বগা লেক, কেওক্রাডং থেকে যাত্রা করি বাকত্লাই পাড়ার উদ্দেশে। কেওক্রাডং থেকে বাকত্লাই ট্রেইল চড়াই-উতরাই। বাঁশবনের ব্যাপক উপস্থিতি আর বনস্পতির ছায়াও আছে ছায়া দেয়ার জন্য। পথেই পড়বে কপিতাল চূড়া। ট্রেকারদের কাছে এটিও বেশ জনপ্রিয়। দিনভর ট্রেকিং করে পাড়ার কাছাকাছি আসতেই দৃষ্টিগোচর হলো তাজিনডং। তিনটি আলাদা আলাদা চূড়ার সমষ্টি এ পাহাড়। তাজিনডং এদের সেই বাহারি নাম।  আপাতত আজকের রাতটি থাকতে হবে বাকত্লাই। এ পাড়ার কাছেই বাকত্লাই ঝরনা। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ঝরনা। প্রায় চার শ ফুট উঁচু। পরদিনই তাজিনডং সামিট! সেদিন সকাল বেলা রওনা হয়ে দুপুরের মধ্যেই তাজিনডংয়ের কোল ঘেঁষে সিপ্লাম্পিপাড়া। বাকত্লাইপাড়া থেকে তাজিনডং হাতছোঁয়া দূরত্ব মনে হলেও আসলে তখনো বহুদূর।

পাড়ায় খানিক বিশ্রাম নিয়ে, প্রয়োজন না হওয়ায় ব্যাগগুলো সেখানে রেখে ছুটলাম তাজিনডং পানে। সিপ্লাম্পিপাড়া থেকে তাজিনডং দেড় ঘণ্টা লাগে। পা চালিয়ে হাঁটলে আরো কম লাগবে। ঝিরি পার হয়ে,গাছের ছায়ায় ঢাকা পথগুলো পেরিয়ে এবারও উঠতে হবে চড়াই বেয়ে। এই পথে এ রকম দুটি চড়াই আছে। প্রতিটির মাথায় উঠেই প্রয়োজন হবে একটু জিরিয়ে নেয়ার। তিনটি চূড়া চোখে ধাঁধা লাগতে পারে। মনে হতে পারে এই বুঝি এসে পড়লাম। তাজিন এবং ডংয়ের মধ্যে মাঝখানের জিন-ই হলো সামিট পিক। শেষ কয়েক মিটার বেশ খাড়া। এটুকু পেরোতেই অবশেষে তাজিনডং। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে চালা নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে বসলে চোখে পড়বে আদিগন্ত ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি। ঠিক যেন আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায়। তাজিনডং আসার সহজতম পথ হলো থানচি হয়ে আসা। থানচি উপজেলা সদরের পরে বোর্ডিংপাড়া তারপর শেরকরপাড়া। সেখান থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ তাজিনডং। থাকা-খাওয়া স্থানীয় পাড়ায়। থানচিতে প্রচুর গাইড পাওয়া যায়। একটু দরদাম করে নিলে সহজেই ঘুরে আসতে পারবেন তাজিনডং।

সিপ্পি আরসুয়াং...

এ চূড়া বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায়। বান্দরবান শহর থেকে এক ঘণ্টার বাসযাত্রায় চলে আসা যায় রোয়াংছড়ি। সেখানে সেনা ক্যাম্প এবং থানায় রিপোর্ট করে গাইড নিয়ে চলে যেতে হবে রনিনপাড়া। এটিকে বলা যায় সিপ্পির বেস ক্যাম্প। আমি গিয়েছিলাম বন্ধু শাফিনকে নিয়ে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি। তীব্র শীত। এর মধ্যে রোয়াংছড়ি নামতেই শুরু হলো বৃষ্টি। একে তো বৃষ্টি তারপর শীত। মাঘের বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই পৌঁছে গিয়েছিলাম রনিনপাড়া। পরদিন খুব সকালে শুরু করলাম সিপ্পি চূড়ার দিকে ট্রেকিং। রনিনপাড়া থেকে সিপ্পি ট্রেইল ধীরে ধীরে আকাশমুখী হয়েছে। সিপ্পি রেঞ্জে পাহাড়চূড়া তিনটি। মূল সামিট চূড়াটি দূর থেকে চেনা গেলেও যতই কাছে আসতে থাকবেন ততই চোখে ধুলো দিতে সে লুকোচুরি খেলতে শুরু করবে অন্য চূড়াগুলোর  আড়ালে। মোট চারটি ধাপ মানে চারটি পাহাড় অতিক্রম করে পৌঁছাতে হবে সিপ্পি চূড়ায়। এর মধ্যে একবার ট্রেইল ছেড়ে অনেকখানি নিচে নেমে একটি ঝিরি ধরে এগোলাম। এরপর আবার সেই একঘেয়ে একটানা ওঠা। আমি একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম। পুরো খাড়াই উঠে দেখলাম সবাই বসে আছে। নিচে অতলান্তিক খাদ। একটি রাস্তা জঙ্গলে হারিয়ে গেছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। ভাবলাম রাস্তা ভুল হয়েছে কি না। সিংগুম জানালো সামনে যে ঘন শণের বন দেখা যাচ্ছে সেটির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। চোখে কি ভুল দেখছি। ওখানে কোনো রাস্তাই নেই। আসলে শণের বন আর বাঁশ কেটে আমাদের এগোতে হবে। গত কয়েক মাসে আমার জানা মতে সিপ্পিতে কোনো অভিযান হয়নি। ফলে কোনো ট্রেইল নেই। আর এ বছর এ পাহাড়ে কোনো জুমও হয়নি। ফলে জঙ্গলে একাকার অবস্থা। মজা টের পেলাম শণের বনে ঢুকতেই। পাড়া থেকে নেয়া গাইড সিংহুম সবার আগে হাতের দা দিয়ে শণ কেটে রাস্তা বানাচ্ছে আর আমরা এগোচ্ছি। শণ ভীষণ ধারালো। ভাগ্যিস গায়ে ফুলহাতা শার্ট আছে। নইলে শরীর কেটে একাকার হতো। কিন্তু মুখ তো খোলা। শণের ধারালো আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হতে লাগল। কখনো মাথা নিচু করে, কখনো উবু হয়ে শণবনের অংশটুকু পার হয়ে এবার পেলাম বাঁশবন। আমরা যেখান থেকে শণবনের ভেতরে ঢুকেছিলাম সেখান থেকে একটা চূড়া দেখা যাচ্ছিল। সেটি পেরিয়ে সমতল অংশ । এখানে বাঁশের ব্যাপক আধিক্য। শণের বন তাও হাঁচড়েপাঁচড়ে পার হয়েছি কিন্তু বাঁশবন কীভাবে পার হব!! ঝাকড়া বাঁশপাতায় পুরো জায়গা অন্ধকার। সন্ধ্যার মতো আবহ। সিংহুমকে অনুসরণ করে এগোচ্ছি। একসময় দেখলাম সামনেই গর্তে মতো একটি জায়গা। সিংহুম জানাল, এটিই সিপ্পিচূড়া। মূলত রোয়াংছড়ি সদর থেকে রনিনপাড়া হয়ে যাওয়া যায় সিপ্পিতে। রোয়াংছড়ি সদরে গাইড আছে। তাদের সঙ্গেই যেতে হবে সে পথে।  

 

কির্সতং রুংরাং...

বসন্তের নির্মেঘ আকাশে বসে মহাশক্তিমান সূর্যদেব প্রকৃতির ওপর মেজাজ দেখাচ্ছেন।  নিচে পাহাড়ি উপত্যকায় বসন্ত দিনে তাই আগুন লেগেছে চারপাশে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে আমাদের দুটি ভাড়া করা দেড় শ সিসির মোটরসাইকেল। কখনো পথ উঠে যাচ্ছে আকাশের পানে আবার কখনো ধরনিতলে। থানচি আলী কদম রাস্তা ধরে যারা এখনো যাননি তারা অন্তত অ্যাডভেঞ্চারের জন্য হলেও বাইকে পুরো পথটুকু পাড়ি দিতে পারেন। কথা দিচ্ছি তাতেই অ্যাড্রোনালিনের ষোলকলা পূর্ণ হবে। আমরা চলেছি কির্সতং রুংরাংয়ের পথে। আলী কদম উপজেলার এ দুটি পাহাড়চূড়ায় এখন প্রচুর মানুষ যাচ্ছেন। থানচি হয়ে দেশের সর্বোচ্চ রাস্তা ধরে এসে নামতে হবে তেরো মাইল এলাকায়। এখান থেকে সহজেই গাইড পাওয়া যায়। সেখান থেকে দুস্রি ঝিরি হয়ে মেনকিউপাড়া। এ এলাকা ম্রো আদিবাসী উধ্যুষিত। মেনকিউপাড়া থেকে গাইড নিয়ে যেতে হবে মেনিয়াংপাড়ায়। এ পাড়ার ঠিক ওপরেই রুংরাং চূড়া। রুংরাং মানে ধনেশ পাখি। একসময় এখানে প্রচুর ধনেশ পাখি পাওয়া যেত। রুংরাং থেকে কয়েক ঘণ্টা হাঁটলেই কির্সতং। বিখ্যাত চিম্বুং রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়া এটি। এ পথটুকুতে আপনাকে পার হতে হবে আদিম এক বনভূমি। বিশাল সব বনস্পতির সমারোহ এ বনে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের অসাধু তৎপরতায় ধ্বংস হচ্ছে এ বন। কির্সতং সামিট করে যে পথে এসেছেন ফিরতে পারেন একই পথে। আবার দুস্রি বাজার হয়েও ফেরা যায়। থানচির তিন্দু বাজার যাওয়ার রাস্তাও আছ এখান থেকে।

ছবি: লেখক

লাইফস্টাইল বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : ‍[email protected]

সাম্প্রতিক

চারশ উইকেট ক্লাবে রবিচন্দ্রন অশ্বিন

চারশ উইকেট ক্লাবে রবিচন্দ্রন অশ্বিন

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা

এটাই মানবতা

এটাই মানবতা

করোনা টিকা নিলেন সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ 

করোনা টিকা নিলেন সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ 

শহীদ রফিক স্মৃতি পরিষদের আত্মপ্রকাশ

শহীদ রফিক স্মৃতি পরিষদের আত্মপ্রকাশ

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত গার্হস্থ্য অর্থনীতি শিক্ষার্থীদের অবস্থান

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত গার্হস্থ্য অর্থনীতি শিক্ষার্থীদের অবস্থান

প্রক্টরের সামনে শিক্ষার্থীকে মারধর!

প্রক্টরের সামনে শিক্ষার্থীকে মারধর!

মেডিকেল অক্সিজেনের অভাবে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা

মেডিকেল অক্সিজেনের অভাবে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা

পাখি কোথায় তোমার ঘর...

পাখি কোথায় তোমার ঘর...

রোমাঞ্চকর মায়াবী কির্সতং

রোমাঞ্চকর মায়াবী কির্সতং

সৌন্দর্যের হাতছানি তিস্তা ব্যারাজে

সৌন্দর্যের হাতছানি তিস্তা ব্যারাজে

সোমেশ্বরীর তীরে বিরিশিরি ও দুর্গাপুর

সোমেশ্বরীর তীরে বিরিশিরি ও দুর্গাপুর